বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

মামলায় না গিয়ে জমির বিরোধ নিষ্পত্তি করার উপায়

Published

on

দেশে লাখ লাখ দেওয়ানি মোকদ্দমার বেশির ভাগই জমি নিয়ে। ফৌজদারি মামলারও উল্লেখযোগ্য অংশের মূলে এই জমি। এসব মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে কেটে যায় বছরের পর বছর। খরচ হয় বিপুল অর্থ। অপচয় হয় বহু সময়, শ্রম ও মেধা। শেষে এমনও দেখা যায়, জমির মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়ে গেছে মামলা-মোকদ্দমার পেছনেই! এসব বিবেচনায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির গুরুত্ব অপরিসীম।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ২০০১ সালে সালিস আইন প্রণীত হয়। পরবর্তী সময়ে দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করে ৮৯এ ও ৮৯বি ধারা যুক্ত করা হয় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যই।

বর্তমানে যেকোনো দেওয়ানি মোকদ্দমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির। এ জন্য আদালত পক্ষদের মেডিয়েশনের (মধ্যস্থতা) জন্য সময় দেয়। মধ্যস্থতায় সমাধান না হলেই বরং ইস্যু গঠন করে বিচার শুরু হয়।

খাজনা: অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর কীভাবে দেবেনখাজনা: অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর কীভাবে দেবেন
অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩-এর ২২ ধারায় মেডিয়েশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এমনকি জারি মামলা পর্যায়েও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এই আইনের ৩৭ ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে।

এখন শুধু দরকার মানুষের সদিচ্ছা এবং আইনজীবী বা সমাজ মাতব্বর শ্রেণির লোকজনের সৎ পরামর্শ। একজন মানুষ আদালতে যাওয়ার আগে সাধারণত আইনজীবীর পরামর্শ নেন। তাই আইনজীবী যদি মামলার মেরিট সম্পর্কে যথাযথ পরামর্শ দেন, তাহলে অনেক মামলাই হয়তো আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। এ ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে মামলা ছাড়াই।

Advertisement

একটি জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা মূলত শুরু হয় সিএস রেকর্ড থেকে। সিএস রেকর্ডের মালিকের কাছ থেকে তাঁর ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী) মালিক হতে পারে বা বিক্রি, হেবা (দান), পত্তন (সাময়িক বন্দোবস্ত) ইত্যাদির মাধ্যমেও অন্য কেউ মালিক হতে পারে। বিক্রি দলিল বহু আগে থেকেই লিখিত হলেও পত্তন ও হেবা আগে মৌখিকভাবে হতো। এ অবস্থায় যদি এসএ ও আরএস রেকর্ডে মৌখিক পত্তন বা হেবা গ্রহীতার নাম রেকর্ড হয়, তবে সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে তাঁর মালিকানা সঠিক। যদি না সিএস রেকর্ডীয় মালিকের ওয়ারিশেরা ভিন্ন কোনো দলিল দেখাতে পারেন।

জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য দলিল ও পরচা—এই দুই ডকুমেন্টই মূল। দলিল একা প্রাধান্য পায়, পরচা মূলত দখলের প্রমাণ হলেও কোনো দলিলের অনুপস্থিতিতে মালিকানা প্রমাণের জন্যও পরচার ওপর নির্ভর করতে হয়।

তাই ভূমি নিয়ে বিরোধে জড়ানোর আগে বা আদালতে মামলা করার আগে নিজের স্বত্বের শক্তিটা বুঝে নিন। স্বত্ব দুর্বল হলে আদালতে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। যদিও আপনি অর্থ ব্যয় করেই জমিটি কিনেছেন। তাই জমি কেনার সময়ই আপনাকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। যিনি জমি বিক্রি করছেন তাঁর নামে সর্বশেষ রেকর্ড বা নামজারি আছে কি না; তিনি খাজনা দেন কি না; অন্তত এসএ রেকর্ড পর্যন্ত মালিকানার ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না জেনে নিন।

জমিতে আপনার দখল থাকলেও সেটি অন্যায় দখল হলে তা ছেড়ে দিতে দ্বিধা করা উচিত নয়। জমি কেনার আগে যথাযথভাবে কাগজ যাচাই-বাছাই না করে কিনলে এ জন্য যা ক্ষতি তা একদম প্রাথমিক পর্যায়েই বরণ করে নিন। দীর্ঘদিন আদালতে ঘুরে খরচ করে জমিটা যদি না-ই পান, তবে ক্ষতি কিন্তু দ্বিগুণ হচ্ছে।

এসএ এবং আরএস রেকর্ড দীর্ঘদিন আগে হয়েছে। সেই রেকর্ড ভুল দাবিতে সিএস রেকর্ডীয় মালিকের সাকসেশর (উত্তর পুরুষ) হিসেবে বর্তমানে মামলা করে জেতার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই এ রকম দুর্বল স্বত্ব নিয়ে আদালতে না যাওয়াই ভালো। তবে এসবের যেকোনো একটি রেকর্ড ভুল হলে তার প্রতিকার চাওয়া উচিত।

Advertisement

সর্বোপরি তামাদি আইনের যথাযথ প্রয়োগও আদালতে মামলার পরিমাণ কমাতে পারে। ১৯৬০ সালের রেকর্ড ভুল দাবি করে ২০২৩ সালে মোকদ্দমা চলতে দেওয়া তামাদি আইনের উদ্দেশ্যই ব্যাহত করে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কীভাবে হতে পারে?
ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গ্রাম আদালতে বা গ্রাম্য সালিসের মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি হতে পারে। তবে রোয়েদাদ (বিরোধের বিষয়বস্তুর ওপর সালিসি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সিদ্ধান্ত) অবশ্যই লিখিতভাবে হতে হবে। আর সালিসদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই পক্ষদের সম্মতি থাকতে হবে।

আইনজীবীর মাধ্যমে পক্ষদের নোটিশ দিয়েও সালিসি পরিষদ গঠন করে পক্ষগুলোর মতামতের ভিত্তিতে নিয়োগকৃত সালিসরাও বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেন।

প্রতিটি জেলায় রয়েছে লিগ্যাল এইড অফিস। যেখানে একজন সহকারী জজ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মাধ্যমে সালিসি পরিষদ গঠন করেও বিরোধ নিষ্পত্তি হতে পারে।

সর্বোপরি নিজের মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, মেনে নেওয়ার সদিচ্ছা এবং নীতিনৈতিকতা বোধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবেই আদালতের বাইরে এই বিরোধ নিষ্পত্তি হতে পারে।

Advertisement

লেখক: মো. ফয়জুল্লাহ ফয়েজ, ঢাকা
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সর্বাধিক পঠিত

Exit mobile version