আবাসন সংবাদ
থমকে আছে আবাসন শিল্প
ঢাকাকে বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নতুন ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা ‘ড্যাপ’ নামে পরিচিত। গত বছরের আগস্ট থেকে এটি কার্যকর করা হয়। কিন্তু শুরু থেকে ড্যাপ (২০২২-৩৫) নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নেতারা বলেছেন, নতুন ড্যাপ বৈষম্যমূলক। বর্তমানে আবাসনশিল্পে যে সংকট চলছে তাতে প্রধান সমস্যা এই ড্যাপ। এটি আবাসন খাতের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ড্যাপ সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলেন, এটি সংশোধন না করা হলে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে দেশের কর্মসংস্থানে অবদান রাখা আবাসন খাত।
কী আছে নতুন ড্যাপে
খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড্যাপের খসড়া পরিকল্পনায় ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) ভিত্তিতে ভবনের আয়তন নির্ধারণের সুপারিশ করে রাজউক। এতে গুলশান, বনানী কিংবা ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত এলাকার তুলনায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, বাসাবোসহ অপরিকল্পিত এলাকায় ভবনের আয়তন কম নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে বেশির ভাগ এলাকায় আগে ফ্ল্যাট তৈরির জন্য যে আয়তন বা জায়গা পাওয়া যেত, সে তুলনায় এখন ৬০ শতাংশ পাওয়া যাবে। এতে জমির মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি ও ক্রেতা সবাই ক্ষতির মুখে পড়বেন।
নতুন ড্যাপ অনুযায়ী, আবাসন খাতের জন্য ভবন নির্মাণে পরিকল্পিত এলাকা যেমন- গুলশানে পাঁচ কাঠা জায়গায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও বেশি ধরা হয়। ফলে গুলশানে উঁচু ভবন করা যাবে। ফ্ল্যাটসংখ্যা বেশি হবে। পক্ষান্তরে অপরিকল্পিত এলাকা যেমন- বাসাবোতে পাঁচ কাঠা জায়গায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কম থাকায় বাসাবোতে সবোর্চ্চ চার থেকে পাঁচ তলার বেশি ভবন করা যাবে না। ফলে ফ্ল্যাটসংখ্যাও কম হবে। অর্থাৎ যেসব এলাকায় যত বেশি এফএআর, সেখানে ভবনের আয়তন তত বেশি পাওয়া যায়। ফলে ফ্ল্যাটসংখ্যাও বেশি হবে।
রিহ্যাব নেতারা বলেন, ড্যাপে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত এলাকার জন্য পৃথকভাবে ভবন নির্মাণের যে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বৈষম্যমূলক। নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় এমনটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

গ্রাফিকস
নতুন ড্যাপের কারণে আবাসন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে দাবি করছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, ড্যাপ কার্যকর হওয়ার পর থেকে জমির মালিকরা ভবন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। নতুন প্রকল্পও নেওয়ার হার কমেছে। ড্যাপ সংশোধন না হলে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যাবে। এমনিতেই এই ব্যবসায় মন্দা চলছে। নতুন ড্যাপের কারণে মন্দা আরও গভীর হয়েছে।
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘ড্যাপের সমস্যা নিরসন হচ্ছে না বলে ডেভেলপাররা নতুন প্রজেক্ট নিতে পারছে না। বসুন্ধরা, ধানমন্ডিসহ পরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও বেশি ধরা হয়েছে নতুন ড্যাপে। এটি যত বেশি হবে, তত বেশি উচ্চ ভবন করা যাবে। কিন্তু মিরপুর, বাড্ডাসহ অপরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কম। ফলে এসব এলাকায় পাঁচতলার বেশি উঁচু ভবন করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে পরিকল্পিত এলাকা খুবই কম। ৯০ শতাংশই অপরিকল্পিত এলাকা। নতুন ড্যাপে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে জমির মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
রাজউক বলেছে, শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানোর জন্য অপরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কমানো হয়েছে। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রিহ্যাবের সাবেক এই নেতা বলেন, ‘এ ধারণা ঠিক নয়। আমি মনে করি, ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানো যাবে না। সারা দুনিয়ায় এখন উঁচু ভবন হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ড্যাপ সংশোধন করলে আবাসন খাত চাঙা হবে। এটি করা হলে জমির মালিক, ডেভেলপার ও ক্রেতা সবাই উপকৃত হবেন।’
রিহ্যাব অপরিকল্পিত এলাকায় ভবনের আয়তন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিধিমালা সংশোধনের একগুচ্ছ প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে রাজউককে দিয়েছে। রাজউক বলেছে, তারা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। রিহ্যাবের সহসভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, ‘২০ অক্টোবর রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ড্যাপের কারণে পুরো সেক্টরই স্থবির হয়ে গেছে। নতুন নিয়মে জমির মালিকরা ভবন নির্মাণে উৎসাহিত হচ্ছেন না। আবার ডেভেলপারদেরও পোষাচ্ছে না। যার জন্য এই সেক্টরে একটা কৃত্রিম শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দুই বছর ধরে এই শূন্যতা চলছে বলে জানান তিনি। ড্যাপ সংশোধন হলে এই সেক্টর আবার চাঙা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজউক ২০২০ সালে দ্বিতীয় ড্যাপের (২০২২-৩৫) খসড়া প্রকাশ করে। গত বছরের আগস্টে পাস হওয়া এই ড্যাপ ছয়টি স্বতন্ত্র অঞ্চলে বিভক্ত। সেগুলো হচ্ছে কেন্দ্রীয় অঞ্চল: ঢাকা শহর, উত্তর অঞ্চল: গাজীপুর সিটি করপোরেশন, পূর্ব অঞ্চল: কালীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণ অঞ্চল: নারায়ণগঞ্জ, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল: কেরানীগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিম অঞ্চল: সাভার উপজেলা।
রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘ড্যাপের সমস্যার সমাধান না হলে আবাসনশিল্প কোনো দিন ভালো হবে না। ঢাকা শহরের ৯০ শতাংশই অপরিকল্পিত এলাকা। নতুন ড্যাপের ফলে ওই সব এলাকায় পাঁচতলার ওপরে ভবন করতে দিচ্ছে না রাজউক। ফলে ওই সব এলাকায় নতুন কোনো ভবন তৈরি হচ্ছে না। আমরা ড্যাপের সংশোধনী চাই। আগের নিয়মে ফিরে যেতে চাই। যেখানে ভবন নির্মাণে এলাকাভেদে কোনো পার্থক্য থাকবে না।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবনের বেশি আয়তন বা
উচ্চতা দিলে ঢাকা আরও বেশি বাসযোগ্য হবে।
রিহ্যাবের সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এ মুহূর্তে আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ড্যাপ। এ সংকটের সমাধান না হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে আবাসন খাত।’
নির্মাণসামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া
ডলারসংকট, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতাসহ নির্মাণশিল্পের অন্যতম উপকরণ রড, সিমেন্টসহ প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এখনো প্রতি টন রড গ্রেডভেদে ৯০ থেকে ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে দাম আরও বেশি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ‘বড় বড় আবাসন কোম্পানি থেকে শুরু করে ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকে নির্মাণকাজ করলেও সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তাই রডের চাহিদা কমে গেছে। তবে চাহিদা কমলেও দাম কমেনি।’
রিহ্যাব নেতারা বলেন, ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম আগে থেকেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। বিভিন্ন কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনা এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই আবাসন খাত এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এতে ফ্ল্যাট বিক্রি তলানিতে পৌঁছেছে।
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভোক্তারা এখন আগের মতো ফ্ল্যাট ক্রয়ে উৎসাহী নয়। অনেক দিন ধরে আবাসন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। ড্যাপের কারণে মন্দা আরও বেশি হয়েছে।’
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে
ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।
গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।
এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।
পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।
মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।
বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।
ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।
মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।
প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’
তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা
ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও পরাঘাতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁরা ভূমিকম্প–পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে মতামত দেন। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করার কথাও বলেন তাঁরা।
এ পটভূমিতে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে যেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তবে বন্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এর আগে আজ রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল।
-
বিবিধ2 years agoবাংলাদেশে প্রচলিত বাড়ি ভাড়ার চুক্তি, নিয়ম ও নীতিমালা
-
নির্বাচিত প্রতিবেদন2 years agoরিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন যেভাবে
-
আবাসন সংবাদ3 months agoরাজউকের নির্দেশে নর্থ সাউথ গ্রীন সিটি বন্ধ
-
আইন-কানুন3 months agoদলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়
-
আবাসন সংবাদ3 months agoসীমান্ত রিয়েল এস্টেট এর অনুমোদনহীন সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি প্রকল্প
-
আইন-কানুন2 years agoরিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের সাথে জমি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সমস্যা ও তার প্রতিকার (১ম পর্ব)
-
আবাসন সংবাদ3 months agoপ্রিমিয়াম হোল্ডিংয়ের বর্ষপূর্তিতে ৩ দিনব্যাপী একক আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত
-
আবাসন সংবাদ11 months agoবন্ধ হচ্ছে অবৈধ আবাসন প্রকল্প
