রাজধানীর পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং ড্যাপ (DAP) বাস্তবায়নে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ড্যাপ সংশোধন, FAR বৃদ্ধি, STP স্থাপন, সেটব্যাকসহ আবাসন খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে যৌক্তিক প্রস্তাব তুলে ধরেছে রিহ্যাব।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৪:৩০টায় এ মতবিনিময় শুরু হয়। ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে রাজউকের ২০ জনেরও অধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজালের নেতৃত্বে রিহ্যাব পরিচালনা পর্ষদ (২০২৬–২০২৮)-এর পরিচালক বৃন্দ সভায় অংশ নেন।
মতবিনিময় সভায় রিহ্যাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আউয়াল, সাবেক প্রেসিডেন্ট তানভিরুল হক প্রবাল, বিটিআই-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এফ. আর. খান, রূপায়ণ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মাহির আলী খান রাতুল, এ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট এ্যান্ড হোল্ডিং লিঃ এর চেয়ারম্যান সেলিম আখতার খান, সংসদ সদস্য এম ফখরুল ইসলামসহ রিহ্যাবের সাবেক নেতৃবৃন্দ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন উদ্যোক্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
মতবিনিময় সভায় রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ. এফ. এম. ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মোঃ হারুন অর রশিদ, পরিচালক মোঃ মাহবুবুর রহমান, প্রকৌশলী মোঃ জাহিদ হোসেন, আলহাজ্ব মোঃ গোলাম কিবরিয়া মজুমদার, প্রকৌশলী মোঃ মঞ্জুরুল ফরহাদ ফিলিপ, প্রকৌশলী মোঃ মোস্তফা কামাল, এ.জেড.এম. কামরুদ্দিন, আলহাজ্ব প্রফেসর ফারুক আহমদ, মোঃ জহির আহমেদ, ক্যাপ্টেন মোঃ শাহ আলম, মোঃ খাজা নজিবুল্লাহ চৌধুরী, উম্মে জাহান আরজু, হাবিবুর রহমান হাবিব, মুহাম্মদ লাবিব বিল্লাহ্, এম ফখরুল ইসলাম, মোঃ এমদাদুল হোসেন সোহেল উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দেশের আবাসন শিল্পের বিদ্যমান সংকট, পরিকল্পিত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ এবং ড্যাপ বাস্তবায়নের ফলে উদ্ভূত বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। রিহ্যাবের পক্ষ থেকে ড্যাপের বিভিন্ন বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে উদ্ভূত সমস্যাগুলো তুলে ধরে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সংশোধনের দাবি জানানো হয়। মতবিনিময় সভায় পরবর্তীতে দিনব্যাপী একটি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হবে এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
বিশেষ করে FAR (Floor Area Ratio) বৃদ্ধি, সেটব্যাক সংক্রান্ত বিধান পুনর্বিবেচনা, উচ্চ ভবন নির্মাণের সুযোগ সম্প্রসারণ, STP (Sewage Treatment Plant) স্থাপনের বাস্তবতা, প্লটের আকার ও অবস্থান অনুযায়ী নীতিমালার নমনীয় প্রয়োগ, নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আবাসন উন্নয়নে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূরীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
রিহ্যাব ড. আলী আফজাল বলেন, বর্তমান ড্যাপের কিছু বিধান বাস্তব প্রয়োগে আবাসন উন্নয়ন কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে। ফলে একদিকে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
সভায় রিহ্যাবের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং উন্নত অবকাঠামো বিবেচনায় যৌক্তিকভাবে FAR বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর সীমিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উল্লম্ব (Vertical) নগরায়ণের ওপর জোর দেওয়া হয়।

এছাড়া STP স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ধরন, জমির পরিমাণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা বিবেচনায় নমনীয় নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে ৫ কাঠা বা ছোট আকারের প্রকল্পে STP স্থাপনের বাধ্যবাধকতা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে সেটব্যাকসহ বিভিন্ন কারিগরি শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান জানান, সেবা সহজীকরণ ও হয়রানি কমাতে নির্মাণ পরিকল্পনা অনুমোদনের সময়সীমা ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, আবাসন খাতে শেয়ারভিত্তিক (Share-based) ব্যবসা পরিচালনার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে, যা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া ভবন নির্মাণ শেষে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট প্রদানের দায়িত্ব রিহ্যাবকে অর্পণের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়, যাতে যোগ্য ও নিয়ম মেনে নির্মিত ভবনের সনদ প্রদান প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, কার্যকর ও অংশীদারিত্বমূলক করা যায়।
রিহ্যাব নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের আবাসন শিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এবং ২৬৯টিরও বেশি লিংকেজ শিল্প জড়িত। তাই আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাস্তবমুখী, বিনিয়োগবান্ধব ও সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সভায় উভয় পক্ষই দেশের স্বার্থে রাজউক ও রিহ্যাবের যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আবাসন খাতের উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিতকরণ এবং জনবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নে ভবিষ্যতেও এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা নিয়মিত আয়োজনের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেন।