বিশ্বজুড়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। তবে শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সেই বিদ্যুৎকে দক্ষ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যবস্থাপনা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করছেন বাংলাদেশি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও গবেষক আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ।
তার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে এমন স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের অবস্থা সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও কার্যকর করবে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াবে এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু চলবে না, বুঝতেও শিখবে
বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। একদিকে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যদিকে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বদলে যায়।
আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহর গবেষণা এমন ব্যবস্থা তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব পরিবর্তন বুঝে দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং শক্তি কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার করলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে সহায়তা করবে।
তার গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক কার্বন কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হয়েছে।

সমস্যা হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়ার চেষ্টা
তার গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য সমস্যা আগেই শনাক্ত করা।
প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক সময় কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রে সমস্যা হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হওয়ার সময়ই তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
আব্দুল্লাহ এর আগে স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও IoT ব্যবহার করে যন্ত্রপাতির সমস্যা আগাম শনাক্ত, শক্তির অপচয় কমানো এবং নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর বিষয়ে গবেষণা করেছেন।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে Forgent Power Solutions-এর VanTran ট্রান্সফরমার ব্যবসায় Sales Engineer হিসেবে কাজ করছেন। মাঝারি ভোল্টেজের ট্রান্সফরমার ও শিল্পক্ষেত্রের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তার গবেষণাকে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে।
তবে তার গবেষণা শুধু ট্রান্সফরমারে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রান্সফরমার তার বৃহত্তর গবেষণার একটি বাস্তব প্রয়োগমাত্র।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির আরও কার্যকর ব্যবহার
সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব হলেও এগুলোর উৎপাদন সবসময় একই থাকে না। রোদ কমলে সৌরবিদ্যুৎ কমে যায়, আবার বাতাসের পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদনও বদলে যায়।
এ অবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চাহিদা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অবস্থা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে।
আব্দুল্লাহর গবেষণার একটি বড় লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করা এবং পুরো ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য করা।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে তথ্যের ব্যবহার
বিশ্বের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো।
আব্দুল্লাহর গবেষণায় বড় আকারের জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় শক্তির অপচয় হচ্ছে, কোথায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায় এবং কীভাবে শিল্পকারখানা আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হতে পারে, এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বিদ্যুৎ খাত ছাড়াও উৎপাদনশিল্প, পরিবহন, তেল ও গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং অন্যান্য জ্বালানি-নির্ভর খাতেও হতে পারে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের জন্য সম্ভাবনা
যদিও আব্দুল্লাহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন, তার গবেষণার বিষয়গুলো কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উন্নত দেশগুলো তাদের পুরোনো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আধুনিক করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
এই দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন আরও দক্ষ, নির্ভরযোগ্য এবং বুদ্ধিমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ বলেন,
“আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন স্মার্ট ও স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা তথ্য থেকে শিখতে পারবে, আগেই সমস্যার পূর্বাভাস দিতে পারবে এবং সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করবে।”
তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলতে পারে।