সেলস, মার্কেটিং ও ব্র‍্যান্ডিং: একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবসার মূল চালিকা শক্তি

Share

একথা অনস্বীকার্য যে, প্রতিযোগিতা মূলক ব্যবসায়িক জগতে টিকে থাকা এবং সফল হওয়ার জন্য সেলস, মার্কেটিং এবং ব্র‍্যান্ডিংÑএই তিনটি শব্দের সাথে প্রতিটি ব্যবসায়ী এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পেশা জীবিই পরিচিত। অনেকে হয়তো এগুলোকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মনে করেন। তাঁরা এই তিনটি বিষয়কে মোটা দাগে একই জিনিষ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এদের প্রত্যেকের ভ‚মিকা এবং কাজের ধরণ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রথমেই একটু জেনে নেয়া যাক সেলস, মার্কেটিং ও ব্র‍্যান্ডিং বলতে আমরা আসলে কি বুঝি।

সেলস্ (Sales) বিক্রয়:
সেলস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ করে একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবা বিনিময়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা হয়।
* সেলস্ এর মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য ক্রেতাকে (Lead) প্রকৃত ক্রেতায় (Customer)
রূপান্তর করা এবং চুক্তি বা বিক্রয় সম্পন্ন করা।
* এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় যে, “পণ্য বা সেবাটি এখনই কিনে নিন।”সরাসরি এটাই
সেলস্ ।

মার্কেটিং (Marketing) বিপণন:

মার্কেটিং হলো সেই সমস্ত কৌশল ও কার্যক্রমের সমষ্টি, যার মাধ্যমে বাজারে পণ্যের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করা হয়। সঠিক গ্রাহকের নজর কাড়া এবং তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করাই মূলত মার্কেটিং।
* মার্কেটিং এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজার গবেষণা, বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচারণার
মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে ব্র‍্যান্ডকে তুলে ধরা এবং যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।
* সহজ- সরল ভাষায় বলা যায় যে, “আমাদের কাছে আপনার সমস্যার বা প্রয়োজনীয়তার দারুণ একটি সমাধান আছে।”

ব্র‍্যান্ডিং (Branding) পরিচিতি ও অনুভুতি
ব্র‍্যান্ডিং হলো একটি ব্যবসার, প্রতিষ্ঠানের বা পন্যের এমনকি কোন ব্যাক্তির স্বতন্ত্র পরিচয়, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব তৈরি করার প্রক্রিয়া, যা গ্রাহকের মনে কোম্পানির একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে।
* গ্রাহকের সাথে মনস্তাত্তি¡ক ও আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা, আস্থা অর্জনে সহায়তা করা এবং
বাজারে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরাই হলো ব্র‍্যান্ডিং এর মূল
উদ্দ্যেশ্য।
* এক কথায় বলা যায় ব্্রান্ডিং হলো “আমরা কে, আমাদের ওপর কেন আপনি ভরসা করবেন
এবং আমাদের কথা আপনার কেন মনে থাকবে।”
একটি ব্যবসা,শুরু করা থেকে সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে এই তিনটি উপাদান কীভাবে একসাথে কাজ করে, তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. সেলস (Sales): ব্যবসার রক্ত সঞ্চালন ও তাৎক্ষণিক রাজস্ব
সেলস বা বিক্রয় হলো যে কোনো ব্যবসার সরাসরি রাজস্ব (Revenue) আয়ের মাধ্যম। এটি গ্রাহকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করে এবং কোনে াপণ্য বা সেবা বিক্রয়ের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে। সম্ভাব্য ক্রেতা বা খদ্দেরকে (Lead) প্রকৃত খদ্দেরে বা ক্রেতায় (Customer) রূপান্তর করাই হলো সেলস্ এর মূল কাজ। স্বল্প মেয়াদী রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং ক্যাশ-ফ্লো (Cash Flow) সচল রাখা যার লক্ষ্য। সেলস আমাদের গ্রাহকের সাথে সরাসরি টেবিলে বসে কথা বলার সুযোগ দেয় বা প্রথম মিটিংটি নিশ্চিত করে। এটি ব্যবসায় তাৎক্ষণিক অর্থ নিয়ে আসে, যা পরিচালনা খরচ চালানোর জন্য অপরিহার্য। সর্বপরি বলা যায় যে, সেলস্ আমাদের প্রথম মিটিং পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং চুক্তি বাস্তবায়ন করে।

২. মার্কেটিং (Marketing): সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি
মার্কেটিং বা বিপণন হলো সেই সমস্ত প্রক্রিয়ার সমষ্টি, যার মাধ্যমে বাজারের সম্ভাব্য গ্রাহকদের জানান দেয়া, যে আপনার কাছে তাদের সমস্যার একটি সমাধান আছে। মার্কেটিং এর মূল কাজই হলো বাজার বিশ্লেষণ, সঠিক টার্গেট অডিয়েন্স খুঁজে বের করা এবং তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা। মার্কেটিং এর প্রধান লক্ষ বলতে আমরা বুঝি, নতুন নতুন লিড (Lead) জেনারেট করা এবং আলোচনার পথ উন্মুক্ত করা। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া প্রমোশন, কনটেন্ট তৈরি ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মার্কেটিং আমাদের ব্যবসাকে মানুষের নজরে নিয়েআসে। এটি সেলস টিমের জন্য কাজের ক্ষেত্র বা রাস্তা তৈরি করে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানকে বা পন্যকে মানুষের নজরে আনে এবং কথোপকথন শুরু করায়।

৩. ব্র‍্যান্ডিং (Branding): আস্থা অর্জন ও দীর্ঘ মেয়াদী স্থায়িত্ব
ব্র‍্যান্ডিং হলো ব্যবসার আসল পরিচয়, ব্যক্তিত্ব এবং অনুভ‚তি। মানুষ আপনার ব্যবসাকে কী ভাবে দেখে বা আপনার নাম শুনলে তাদের মনে কী অনুভ‚তি জাগেÑতা নির্ধারণ করে এই ব্র‍্যান্ডিং। গ্রাহকের সাথে মনস্তাত্তি¡ক ও আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করা এবং বিশ্বাস অর্জন করাই হলো ব্রান্ডিং এর মূল কাজ। দীর্ঘ মেয়াদী গ্রাহক তৈরি করা এবং বাজারে নিজের একটি সতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলাই ব্রান্ডিং এর লক্ষ্য। মার্কেটিং ও সেলসের মাধ্যমে কোনো গ্রাহক এলে, তারা একই প্রতিষ্ঠানের সাথে বারবার কাজ করবে কিনা তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের বা পন্যের ব্র‍্যান্ডিংয়ের ওপর। ভালো ব্র‍্যান্ডিং গ্রাহকের মনে স্থায়ী জায়গা তৈরি করে।এক কথায় বলা যায়, ব্র‍্যান্ডিং প্রতিষ্ঠানকে মনে রাখতে এবং বারবার ফিরে আসতে সাহায্য করে।

কেন একটি ছেড়ে অন্যটিতে ফোকাস করা ভুল?
অনেকে মনে করেন শুধু সেলস বাড়ালেই ব্যবসা সফল হবে, আবার কেউ কেউ শুধু মার্কেটিং নিয়ে পড়ে থাকেন। কিন্তু একটি বাদ দিয়ে অন্যটি দিয়ে দীঘর্ মেয়াদী সাফল্য সম্ভব নয়।

মার্কেটিং ছাড়া সেলস: সেলস টিম মানুষকে সরাসরি ফোন বা মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করতে পারে, কিন্তু পূর্বে পরিচিতি (Brand Loyalty) না থাকলে সেই বিক্রয় সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে।

সেলস ছাড়া মার্কেটিং: আপনি লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপনে অনেক মানুষের নজর কাড়লেন, কিন্তু সঠিক সেলস প্রসেস না থাকলে সেই আগ্রহ থেকে টাকা আয় করা সম্ভব হবেনা।

ব্র‍্যান্ডিং ছাড়া সেলস ও মার্কেটিং: ব্র‍্যান্ডিং না থাকলে প্রতিবার নতুন খদ্দের পেতে প্রতিষ্ঠানকে প্রচুর টাকা ও সময় খরচ করতে হবে, কারণ পুরানো খদ্দেরদের প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো আস্থা বা আনুগত্য (Brand Loyalty) থাকবেনা।

তাই একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক ফর্মুলা হচ্ছে-
সেলস + মার্কেটিং + ব্র‍্যান্ডিং = দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধি (Long-term Growth)
ব্যবসার শুরুতেই তিনটি সমান ভাবে চালানো কঠিন হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুরুর ধাপে (Early Stage) অর্থ্যাৎ প্রথমে মার্কেটিং ও সেলস-এ বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত, যাতে দ্রæত রাজস্ব আসে এবং ব্যবসা সচল থাকে। এবং বৃদ্ধির ধাপে (Growth Stage) ব্যবসা কিছুটা দাঁড়িয়ে গেলে নিয়মিত ব্র‍্যান্ডিং-এ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যাতে গ্রাহকদের সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয় এবং মার্কেটিং ও সেলসের খরচ বা কস্ট অফ একুইজিশন (CAC) কমে আসে।

এক নজরে তিনটির পার্থক্য:

বিষয়   মার্কেটিং সেলস

ব্র‍্যান্ডিং

কাজ গ্রাহককে আকৃষ্ট ও অবহিত করা  সরাসরি বিক্রয় সম্পন্ন করা আস্থা ও পরিচয় তৈরি করা
দৃষ্টিভঙ্গি “আমাকে জানুন ও বুঝুন” আমার জিনিসটি কিনুন আমাকে বিশ্বাস করুন ও মনে রাখুন
ফলাফল লিড (Lead) বা আগ্রহ তৈরি  তাৎক্ষণিক রাজস্ব (Revenue) দীর্ঘ মেয়াদী আনুগত্য (Brand Loyalty)

সংক্ষেপে বলতে গেলেÑমার্কেটিং গ্রাহককে ডেকে আনে, সেলস লেনদেন সম্পন্ন করে, আর ব্র‍্যান্ডিং সেই গ্রাহককে আজীবনের জন্য আপন করে নেয়। একটি দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এই তিনটির সুষম সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই।

Share

Don't Miss

আজ আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের নির্বাচন

রিহ্যাবের স্মরণকালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। মোট ২৯টি পদে সবগুলোতেই সরাসরি ভোট হবে।

জিডিপিতে রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতের অবদান ১৮ শতাংশ: রিহ্যাব

‘কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এর কথাও তুলে ধরেন: নির্মাণ খাতে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে ঋণের উচ্চ সুদ হার, এবং নকশা ও অনুমোদন সংক্রান্ত...

Related Articles

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত: সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। মোট দেশজ...

প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন: শক্তি না বিভক্তির সূচনা?

আমাদের দেশের অধিকাংশ পেশাজীবী, সামাজিক ও বাণিজ্যিক সংগঠনে নির্বাচন এলেই একটি বিষয়...

আমরা কি জেনেবুঝে বিপর্যয় ডেকে আনছি

ঢাকার মাটির নিচে যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, তার সামান্যতম বিচ্যুতিতেও...

আবাসন খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে

দেশের আবাসন খাতের অবস্থা বিভিন্ন কারণে কিছুটা নাজুক। এ খাতের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির...

<