জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে প্রতিবছর বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত বাড়ছেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগর এলাকায় আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নতুন ঘর নির্মাণ প্রয়োজন। শুধু গৃহহীনতাই সমস্যা নয়, দেশে নিরাপদ আবাসন সংকট আরও তীব্র। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ৩০০ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং হাটবাজারের ব্যবস্থা থাকতে হয়। এই বিবেচনায় দেশের কয়েক কোটি মানুষ নিরাপদ আবাসনের বাইরে রয়েছে বলে মনে করছেন আবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
এই বাস্তবতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে আজ সোমবার ৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা বিশ্বের মতো নানা সভা সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস।
সর্বশেষ দেশের জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী গৃহহীন বা পথবাসী মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.০১ শতাংশ। তবে নগর এলাকায় বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ অপরিকল্পিত, ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর অনিরাপদ আবাসনে বাস করে। যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বসতি দিবস উপলক্ষে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, নগরায়ণ যেন অপরিকল্পিতভাবে না হয়, সেজন্য মাস্টার প্ল্যানের আওতায় আবাসন, সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইউএন-হ্যাবিট্যাটের মতে, আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকার। নিরাপদ, সুরক্ষিত, বাসযোগ্য ও সাশ্রয়ী আবাসন না থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকারও বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ আবাসন সংকট শুধু ঘরের সংকট নয়; এর সঙ্গে দারিদ্র্য, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়ও সরাসরি জড়িত।

বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ইউএন-হ্যাবিট্যাটের ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বে সর্বোচ্চ ৩৪০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের সুরক্ষিত ও অপর্যাপ্ত আবাসনে বসবাস করছে। এর মধ্যে ১০০ কোটির বেশি মানুষ অঘোষিত বস্তিতে বাস করে এবং ৩০ কোটির বেশি মানুষ গৃহহীন। বৈশ্বিক আবাসন ঘাটতি ২০১০ সালের ২৫ কোটি ১০ লাখ ইউনিট থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। দ্রুত নগরায়ণ, ভূমির উচ্চমূল্য, সীমিত আয়, আবাসন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং সাশ্রয়ী গৃহঋণের সীমিত সুযোগের কারণে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগর এলাকায় আবাসনের ঘাটতি রয়েছে এবং বর্তমান ঘাটতি পূরণ ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নতুন ঘর নির্মাণ প্রয়োজন।
সবশেষ ২০২২ জন শুমারি অনুযায়ী দেশে ৫ লাখ ৭ হাজার ৪৮৬টি বস্তি পরিবারে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ বসবাস করে। এ ছাড়া ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২২ হাজারের বেশি। শুধু ঢাকা জেলায়ই বস্তি পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ২৬৮ এবং এসব পরিবারের জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার ৬২৮।
বাংলাদেশে আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, সীমিত ভূমি, বাড়তি ভাড়া এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে আবাসন ব্যয়ের বড় ব্যবধান এ সংকটকে আরও জটিল করছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ঢাকার মতো শহরে প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দাকে সারাজীবন ভাড়ায় থাকতে হতে পারে, কারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন ঋণ।
আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ) স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুর-১৬ নম্বর সেকশনে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ, বিভিন্ন জেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক প্রকল্প রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন পরিকল্পনা না করলে আগামী বছরগুলোতে সংকট আরও তীব্র হবে। তাই সরকারি আবাসন প্রকল্পের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি সাশ্রয়ী গৃহঋণ, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি, সরকারি জমির কার্যকর ব্যবহার এবং পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। নাহলে শহর বাড়বে, কিন্তু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের সুযোগ সবার নাগালে আসবে না।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নীতি দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের আবাসন সংকট সমাধান করা অসম্ভব। জাতীয় আবাসন নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক পৌরসভা পর্যন্ত সুষম অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা ও সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়াই হলো টেকসই ও বৈষম্যহীন নগর বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র পথ। এজন্য সরকারকে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নগর এলাকায় আবাসন এর সংকটের টেকসই সমাধান করতে হবে।
আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও বিশ্বখ্যাত ‘নেইবারহুড ইউনিট কনসেপ্ট’-এর ভিত্তিতে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পার্ক ও বাজার থাকতে হয়। কিন্তু এ সুবিধা দেশের গ্রামাঞ্চল ও রাজধানী শহরে এখনও দুর্লভ। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএন-হ্যাবিটেটের তথ্যের বরাত দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বলেন, বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের শহর ও গ্রামের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছে।