আবাসন সংবাদ

বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশি প্রকৌশলীর নতুন দিগন্ত

Share
Share

আধুনিক বিশ্বে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংহতকরণ এবং বিদ্যুৎ চাহিদার ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে প্রযুক্তিগত রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রয়োগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

এই রূপান্তরের অগ্রভাগে কাজ করছেন প্রকৌশলী মোঃ আল ইমরান। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে Siemens Industry, Inc.-এ টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান Siemens-এ তার কাজ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিল্প ও গবেষণার অনন্য সমন্বয়
মোঃ আল ইমরান কেবল একজন দক্ষ প্রকৌশলী নন; তিনি বিদ্যুৎ খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় গবেষকও। তার গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। নিজ ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের শীর্ষ ০.০১% সাইটেশনপ্রাপ্ত গবেষকদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন, যা তার গবেষণার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ।

সিমেন্সে তিনি যখন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার পাওয়ার সিস্টেম ডিজাইন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের গবেষণা, উন্নত বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা
ইমরানের গবেষণার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে এআই এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও বুদ্ধিমান ও স্বয়ংক্রিয় করে তোলা।

১. নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্মার্ট সংহতকরণ
এআই-ভিত্তিক সিমুলেশন মডেল ব্যবহার করে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমন একটি সংহতকরণ সীমা নির্ধারণ করে, যেখানে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, অথচ কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্ন থাকে।

২. আইওটি-নির্ভর সৌর বিদ্যুৎ দক্ষতা
সৌর প্যানেলে স্থাপিত সেন্সর রিয়েল-টাইমে ধুলোবালি শনাক্ত করে। প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিষ্কারের নির্দেশনা দেয় এবং সম্ভাব্য ত্রুটির আগাম পূর্বাভাস (Predictive Maintenance) প্রদান করে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা বজায় থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমে।

৩. বিল্ডিং-ইন্টিগ্রেটেড ফটোভোলটাইক্স (BIPV)

তার গবেষণায় ভবনের জানালা ও সম্মুখভাগকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী উপাদানে রূপান্তরের ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছে। এআই-চালিত কন্ট্রোল সিস্টেম ভবনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে, যা ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটির ভিত্তি গড়ে তুলছে।

উন্নত সিগন্যাল প্রসেসিং ও ফল্ট শনাক্তকরণ
পাওয়ার সিস্টেমে হাই ইমপিডেন্স ফল্ট (HIF) শনাক্তকরণ একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ইমরানের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ প্রবাহ (Current) ও চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) থেকে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়।

এক্ষেত্রে তিনি ডিসক্রিট ওয়েভলেট ট্রান্সফর্ম (DWT) ব্যবহার করেছেন, যা সিগন্যালকে বিভিন্ন স্তরে বিশ্লেষণ করে সূক্ষ্ম বিচ্যুতি বা ট্রানজিয়েন্ট শনাক্ত করতে সক্ষম। পাশাপাশি হিলবার্ট ট্রান্সফর্মের মাধ্যমে সিগন্যালের দশা ও বিস্তার বিশ্লেষণ করা হয়।

এই প্রযুক্তি কার্যত একটি ‘ডিজিটাল স্টেথোস্কোপ’-এর মতো কাজ করে—যা অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ অপচয় এবং সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‘সেলফ-হিলিং’ গ্রিড: ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা
ইমরানের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করতে সক্ষম ‘সেলফ-হিলিং’ গ্রিড তৈরি করা। এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বিচ্ছিন্ন করে বিকল্প লাইন সক্রিয় করতে পারে।

তার এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান সিমেন্সের মাধ্যমে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে।

প্রকৌশল দর্শন ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
প্রকৌশলী মোঃ আল ইমরান বলেন: “প্রকৌশল মানে কেবল বর্তমান সমস্যার সমাধান নয়; এটি হলো নিরন্তর উদ্ভাবনের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। আমার লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে এমন এক পাওয়ার গ্রিড তৈরি করা যা হবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব।”

বিদ্যুৎ খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্রয়োগ কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Share

Don't Miss

সীমান্ত রিয়েল এস্টেট এর অনুমোদনহীন সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি প্রকল্প

বাংলাদেশের আবাসন খাতে আবারও বড় ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে সীমান্ত রিয়েল এস্টেট লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি নামে দুটি প্রকল্পের...

ডম-ইনো এফেক্ট: ফ্ল্যাট ক্রেতারা প্রতারিত, প্রকল্পগুলো পরিত্যক্ত

এক সময় রাজধানীর আবাসনখাতে পরিচিত নাম ছিল ডম-ইনো প্রপার্টিজ লিমিটেড। আধুনিক আবাসন নির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে তারা প্রায় দুই দশক রাজধানীর অভিজাত এলাকায় প্রকল্প চালু...

Related Articles

জিডিপিতে রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতের অবদান ১৮ শতাংশ: রিহ্যাব

‘কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এর কথাও তুলে ধরেন: নির্মাণ খাতে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি,...

আবাসন খাতের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান মোহাম্মদ আলিম উল্লাহ

দীর্ঘদিন ধরে আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আবাসন ব্যবসায় মোহাম্মদ আলিম উল্লাহ...

১৪ বছরের সংগ্রামের পর রিহ্যাবে নির্বাচন: এক অসহনীয় আন্দোলন

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্বাচনহীন অবস্থায় ছিল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী আবাসন ব্যবসায়ীদের...

রিহ্যাব নির্বাচনে ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’ থেকে লড়ছেন এম. ফখরুল ইসলাম

রিহ্যাব নির্বাচন ২০২৬-২৮ এর পরিচালক পদে ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’ থেকে লড়ছেন...

<