আমাদের দেশের অধিকাংশ পেশাজীবী, সামাজিক ও বাণিজ্যিক সংগঠনে নির্বাচন এলেই একটি বিষয় প্রায় স্বতঃসিদ্ধভাবে সামনে আসে—প্যানেলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সংগঠনের গঠনতন্ত্র বা বাইলজে প্যানেলের বিধান থাকুক বা না থাকুক, বাস্তবতায় দেখা যায় বিভিন্ন গ্রুপ বা প্যানেল গড়ে ওঠে, এবং নির্বাচন একটি দলগত লড়াইয়ে পরিণত হয়।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি সংগঠনের জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে। কারণ, প্যানেল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সংগঠিত করে, প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে এবং ভোটারদের জন্য একটি “কমপ্যাক্ট অপশন” তৈরি করে। অনেক সময় একটি সুসংগঠিত প্যানেল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ভিশন ও টিমওয়ার্কের একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে—যা একক প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে।
কিন্তু সমস্যাটি শুরু হয় অন্য জায়গায়।
প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন প্রায়ই ব্যক্তি যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দেখা যায়—একজন দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী শুধুমাত্র প্যানেলের বাইরে থাকার কারণে নির্বাচনে হেরে যান। অন্যদিকে, প্যানেলের ভেতরে থাকা কিছু তুলনামূলক অযোগ্য প্রার্থী শুধুমাত্র “প্যাকেজ ভোটিং”-এর কারণে নির্বাচিত হয়ে যান।
এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো—সংগঠনের ভেতরে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়। নির্বাচন-পূর্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও থেকে যায়, যা সংগঠনের কার্যক্রমকে দুর্বল করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সরকারি দল ও বিরোধী দলের মতো একটি স্থায়ী দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, যেখানে মূল লক্ষ্য—সংগঠনের উন্নয়ন—পিছনে পড়ে যায়।
ভোটারদের মধ্যেও তখন একটি মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি হয়। তারা ব্যক্তি বা নীতির ভিত্তিতে নয়, বরং “আমার প্যানেল” বনাম “ওদের প্যানেল”—এই মানসিকতায় ভোট দেন। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৌলিক সৌন্দর্য—স্বাধীন ও বিবেকভিত্তিক সিদ্ধান্ত—ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানেই প্যানেল সংস্কৃতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শক্তিশালী প্যানেলের মূল নেতৃত্বের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে অনেক সময় এমন কিছু অযোগ্য, অদক্ষ বা সুবিধাবাদী ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে যান, যারা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে কখনোই জয়ী হতে পারতেন না। “ফুল প্যানেল” জেতানোর প্রবণতা ব্যক্তিগত সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়নকে দুর্বল করে দেয়। ফলে যোগ্য প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়েন, আর অযোগ্যরা নীতিনির্ধারণী অবস্থানে চলে আসেন—যা সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সদস্যদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করে।
তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে—প্যানেলের বাইরে গিয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রার্থীদেরও উচিত প্যানেল নির্ভরতার বাইরে এসে নিজেদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কর্মপরিকল্পনা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা।
তৃতীয়ত, নির্বাচনের পর সকল পক্ষকে একসাথে কাজ করার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে—যেখানে বিভক্তি নয়, ঐক্যই হবে শক্তি।
সবশেষে বলা যায়—প্যানেল নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হলো প্যানেলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। যদি আমরা ব্যক্তি যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারি, তাহলে প্যানেলও একটি ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, এটি বিভক্তির আরেকটি নাম হয়ে থাকবে।
লেখক: এমজিআর নাসির মজুমদার
প্রাক্তন পরিচালক- এফবিসিসিআই
