আবাসন সংবাদ
গুলশানে সম্পত্তি বিক্রেতা বেড়েছে, ক্রেতা কম
দুই হাজার ৪৩০ বর্গফুট আয়তনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে সম্পত্তি কেনাবেচার ওয়েবসাইট বিপ্রপার্টিডটকমে। অ্যাপার্টমেন্টটির অবস্থান রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায়। ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে একাধিক আলোকচিত্র। বিক্রেতা অ্যাপার্টমেন্টটিকে ‘নান্দনিক’ হিসেবে উল্লেখ করে দাম হাঁকিয়েছেন ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজ্ঞাপন প্রকাশের কয়েকদিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আগ্রহীই যোগাযোগ করেননি।
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় ৪ হাজার ৪৮৩ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির বিজ্ঞাপন বিপ্রপার্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে। ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের এ সম্পত্তিরও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার খোঁজ পাননি বিক্রেতা। ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, আবাসিক প্লট, দোকানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা বিক্রির এমন ৫০টি বিজ্ঞাপন রয়েছে বিপ্রপার্টির ওয়েবসাইটে। কিন্তু ক্রেতাদের সাড়া মিলছে না তেমন। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই এমনটা হয়েছে। বেচাকেনা ৪০-৫০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
নতুনের পাশাপাশি পুরনো জিনিসপত্র ও সম্পত্তি বেচাকেনার অনলাইন প্লাটফর্ম বিক্রয় ডটকম। গত ১১ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে গুলশান এলাকার ৯৬টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রপার্টি বাজারে বেশ ‘স্ট্রাগল’ করতে হচ্ছে বলে বিক্রয় ডটকমের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন অনেক বিক্রেতা রয়েছেন, যারা ওয়েবসাইটে কিংবা গণমাধ্যমে সম্পত্তির বিজ্ঞাপন দিতে চান না। গোপনে বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে তারা নিজেদের সম্পদ বিক্রি করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে গুলশানে এ ধরনের বিক্রেতা বেড়ে গেছে। অথচ কয়েক মাস আগেও বিপুল অর্থ ছড়িয়েও অভিজাত এ এলাকায় সম্পত্তি পাওয়া যেত না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গুলশানে ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনার মালিকদের একটি বড় অংশই আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি। সরকার পতনের পর তাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে নিজেদের সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাই গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ক্রেতার চেয়ে এখন বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি। কেবল গুলশান নয়; অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারাসহ ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় সম্পত্তির বাজারে মন্দা ভাব বিরাজ করছে বর্তমানে।
ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতা বেড়ে যাওয়ায় বিপ্রপার্টির ওয়েবসাইটে বেচাকেনা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক খান তানজীল আহমেদ বলেন, ‘বেচাকেনা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সম্পত্তির অবস্থান, সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের প্লাটফর্মে সম্পত্তি কেনাবেচা অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।’
বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে বরাবরই দেশের বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে গুলশান। রাজধানীতে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হাতে গোনা দু-একটি এলাকার অন্যতম এটি। কূটনৈতিক পাড়া হিসেবে এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাজধানীর অন্যান্য এলাকার চেয়ে অনেক উন্নত। নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি। বিপুলসংখ্যক ধনীর বসবাস, অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অত্যাধুনিক হাসপাতালের উপস্থিতি গুলশানকে প্রতিষ্ঠিত করেছে দেশের সবচেয়ে কুলীন এলাকা হিসেবে।
গুলশানে ফ্ল্যাট কিংবা জমির দামও ঢাকার অন্যান্য এলাকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কলাবাগান, শান্তিনগর, শ্যামলীর মতো এলাকায় যেখানে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম পড়ে ৭-১০ হাজার টাকা, সেখানে গুলশানে কিনতে হয় ১৫-২০ হাজার কিংবা তারও বেশি টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব এলাকার ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ব্যয় লন্ডন-দুবাই-নিউইয়র্কের অভিজাত এলাকাগুলোর বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের মতো গুলশানে জমির দামও বেশি। এখানে বর্তমানে প্রতি কাঠা জমি ২ থেকে ৩ কোটি টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে ‘প্রপার্টি’র বাজারে সবাই ক্রেতার জন্য স্ট্রাগল করছে বলে জানিয়েছেন বিক্রয় ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ঈশিতা শারমিন। তিনি বলেন, ‘প্রপার্টি গ্রাহক এখন তুলনামূলকভাবে কম। সবাই স্ট্রাগল করছেন। তবে প্রপার্টি মার্কেট বছরের শুরু থেকেই স্ট্রাগল করছিল। এখন ভালো সময় হওয়ার কথা থাকলেও ঈদের পরপরই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মার্কেটে সে রকমভাবে আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।’
বর্তমানে তুলনামূলক ছোট প্রকল্পের ক্ষেত্রে রেসপন্স ভালো পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘যে প্রপার্টিগুলোর দাম তুলনামূলক কম, এমন ডেভেলপারের আহ্বানে সাড়া ভালো পাওয়া যাচ্ছে। সেকেন্ড হ্যান্ড প্রপার্টির দাম সব সময়ই কিছুটা কম থাকে, সেখানেও আমাদের সাইটে অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মার্কেট এখন ডাউন। আর প্রপার্টির বর্তমান দাম মধ্যবিত্তদের ক্রয়সীমার মধ্যে নেই।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে গুলশান এলাকায় সম্পত্তি কিনেছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাদের বেশির ভাগই আত্মগোপনে চলে গেছেন। অনেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। আওয়ামী সুবিধাভোগী ব্যক্তিরাই এখন সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টায় রয়েছেন, যা গুলশান এলাকায় সম্পত্তি বিক্রেতার সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে।
অনেকের ক্ষেত্রে প্রপার্টি এখন যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলীনুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যার ক্রয়ক্ষমতা আছে তিনিও চিন্তা করছেন, এখন প্রপার্টি কিনে আবার কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে কিনা। মানুষের জীবনযাত্রার মানে বড় ধরনের একটা বিপর্যয় এসেছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনে লাইফ স্টাইল বদলে গেছে। সবাই চিন্তা করছে, আগে সারভাইভ করি, তারপর প্রপার্টি।’
আবাসন সংবাদ
৪ দিনব্যাপী আবাসন মেলা শুরু
রাজধানীতে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করেছে রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। গতকাল শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারের রিহ্যাব মেলায় ২২০টি স্টল থাকছে। প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন।
বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ খাতে বর্তমানে কিছুটা মন্দা থাকলেও এটি স্থায়ী নয়, সুদিন অবশ্যই ফিরে আসবে।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আজ যদি কোনো প্লট মালিককে নিজের টাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে বলা হয়, তা হলে ঢাকা শহরে কয়টি ভবন আদৌ তৈরি হতোÑ তা ভাবনার বিষয়। ডেভেলপারদের বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন ডেভেলপাররা শুধু নিজেদের ব্যবসার কথা ভাবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই ধারণা সঠিক নয়। হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন ব্যতিক্রম থাকতে পারেন, তবে সবাই একটি সুন্দর, পরিকল্পিত ও নিয়মের মধ্যে গড়ে ওঠা শহরই চান।
রিয়াজুল ইসলাম আরও বলেন, লক্ষ্য শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা। গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণা একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে এ জায়গায় যেতে হবে। তিনি বলেন, যে শহর বা ভবনে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে না, সেই উন্নয়ন কোনো কাজে আসে না। এতে কিছু ব্যক্তি লাভবান হয়, কিন্তু দেশ বা সমাজের উপকার হয় না।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট মো. ওয়াহিদুজ্জামান সদস্য এবং ক্রেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতে মেলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকৎ আলী ভুইয়া আবাসন খাতের বিভিন্ন অবদানের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ)-এর চেয়ারম্যান মোছা. ফেরদৌসী বেগম নিয়ম অনুযায়ী ভবন তৈরির কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রিহ্যাবের পরিচালক ও মেলা কমিটির কো-চেয়ারম্যান মিরাজ মোক্তাদির। অনুষ্ঠানে রিহ্যাবের ভাইস প্রসেডিন্টে-১ লায়ন এমএ আউয়াল (সাবেক এমপি), রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ এবং রিহ্যাব ফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ ইঞ্জি. আব্দুল লতিফ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট হাজি দেলোয়ার হোসেন, রিহ্যাব পরিচালক ও ফেয়ার স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরুজ সরদার, রিহ্যাব পরিচালক ও প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ লাবিব বিল্লাহ্সহ রিহ্যাব পরিচালকবৃন্দ এবং অন্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন। মেলায় দুই ধরনের টিকিট থাকছে। একটি সিঙ্গেল এন্ট্রি অপরটি মাল্টিপল এন্ট্রি। সিঙ্গেল টিকিটের প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। আর মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিটের প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিট দিয়ে একজন দর্শনার্থী মেলার সময় পাঁচবার প্রবেশ করতে পারবেন। এন্ট্রি টিকিটের প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ দুস্থদের সাহায্যার্থে ব্যয় করা হবে। এ বছর প্রতিদিন র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হবে।
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে
ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।
গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।
এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।
পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।
মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।
বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।
ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।
মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।
প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’
তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।
-
বিবিধ2 years agoবাংলাদেশে প্রচলিত বাড়ি ভাড়ার চুক্তি, নিয়ম ও নীতিমালা
-
নির্বাচিত প্রতিবেদন2 years agoরিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন যেভাবে
-
আবাসন সংবাদ5 months agoরাজউকের নির্দেশে নর্থ সাউথ গ্রীন সিটি বন্ধ
-
আইন-কানুন4 months agoদলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়
-
আইন-কানুন2 years agoরিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের সাথে জমি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সমস্যা ও তার প্রতিকার (১ম পর্ব)
-
আবাসন সংবাদ5 months agoসীমান্ত রিয়েল এস্টেট এর অনুমোদনহীন সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি প্রকল্প
-
বিবিধ2 years agoফ্ল্যাট বা অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র নমুনা
-
আবাসন ক্যারিয়ার2 years agoসিরামিক ইঞ্জিনিয়ার হতে চান, তাহলে জানতে হবে যে বিষয়গুলো
