Connect with us

আবাসন সংবাদ

সরকারের পরিচালন ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামোর অংশ কমছে

প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নের সময় বড় একটি অংশ বরাদ্দ রাখা হয় সামাজিক অবকাঠামো খাতে। জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে এ খাতের আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং উন্নয়ন ও সমবায় বাবদ অর্থ ব্যয় করে থাকে সরকার, যা বিবেচিত হয় সরকারের পরিচালন ব্যয়ের অংশ হিসেবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামো খাতের অংশ ছিল সবচেয়ে বেশি। সে সময় মোট পরিচালন বাজেটের ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল এ খাতে। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময় মোট পরিচালন ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামোর অংশ ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৭ দশমিক ২ শতাংশে।

যদিও এ সময়ের মধ্যে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সাত অর্থবছরে পরিচালন ব্যয়ের আকার বেড়েছে ১০৫ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ লাখ ৯ হাজার ২৮ কোটি ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ লাখ ২৬ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে পরিচালন খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে সামাজিক অবকাঠামো খাতে। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে এ বাবদ ব্যয় হয়েছে পরিচালন ব্যয়ের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ। আলোচ্য অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩ লাখ ৯ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সরকার সামাজিক অবকাঠামো খাতে ব্যয় করেছে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২১ কোটি টাকা। এ সময়ে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ২৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে সরকার।

সরকারের খাতভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছে সামাজিক অবকাঠামো খাতে। যদিও সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বেশি ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ গেছে প্রশাসন খাতে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এ খাতের ব্যয়ের বড় অংশ। তাছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সুদ বাবদ পরিচালন ব্যয়ের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণের পরিমাণ বাড়ার কারণে সরকারের সুদ বাবদ ব্যয়ও বাড়ছে। বাড়তি এ ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের অংশ কমে গেছে। যদিও এ খাতে ব্যয় আরো বাড়ার কথা ছিল। অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত হারে সরকার রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতে উন্নয়ন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে সরকারের জন্য। এ ব্যয় মেটানোর জন্য স্থানীয় ও বিদেশী উৎস থেকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা আবার সুদ ব্যয়কে বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

Advertisement

সামাজিক নিরাপত্তাবলয় সুসংহত করার মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ধরনের ভাতা দিচ্ছে সরকার। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর এসব ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে জনপ্রতি টাকার অংকে এ আর্থিক সহায়তার পরিমাণ খুবই কম। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণীতে রয়েছে বয়স্ক, বিধবা ও নিগৃহীতা নারী এবং প্রতিবন্ধীরা। এ তিন শ্রেণীর ভাতাভোগীর সংখ্যা বর্তমানে ১ কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার। বর্তমানে ভাতাপ্রাপ্তদের মধ্যে বয়স্করা প্রতি মাসে ৬০০ টাকা, বিধবারা ৫৫০ এবং প্রতিবন্ধীরা পাচ্ছেন ৮৫০ টাকা। গত পাঁচ বছরের মধ্যে জনপ্রতি বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা ১০০ টাকা এবং নারী ভাতা ৫০ টাকা বেড়েছে। যদিও এ সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে।

সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো হলেও ভাতার পরিমাণ সেভাবে বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার পাশাপাশি দারিদ্র্য মোকাবেলায় ভাতার পরিমাণ না বাড়ানোর কারণে দিন শেষে যেহেতু আমাদের বাজেটের আকার বাড়ছে, সেহেতু এর সঙ্গে তুলনা করলে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ব্যয় কমে আসাই স্বাভাবিক। কভিড ও মূল্যস্ফীতির অভিঘাত মোকাবেলায় ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে মোট ব্যয় যেটি বাড়ছে সেটি যাচ্ছে ভৌত অবকাঠামোয়। এ ব্যয়ের গুণগতমান নিয়েও প্রশ্ন আছে।’

রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে সরকারের যে আয় হয় সেখান থেকেই পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে থাকে। তবে গত সাত বছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় যে হারে বেড়েছে রাজস্ব আহরণ সে হারে বাড়েনি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয় ছিল ২ লাখ ৭৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬২ কোটি টাকায়। এ সময়ে রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ৮২ শতাংশ। যদিও এ সময়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় সামাজিক ও দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের অর্থায়নের বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় অনুমোদন দেয়ার পর সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ এবং রাজস্ব আয় ও অনুদানের অনুপাত ৭১ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজস্বের অনুপাতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে করে দারিদ্র্যবান্ধব ও সবুজ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে অতি প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে পারে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে কর রাজস্ব বাড়ানো এবং ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন, যাতে সামাজিক ও বিনিয়োগ খাতে ব্যয় বাড়ানো যায়। সামাজিক সুরক্ষা স্কিম বিস্তৃত করার সময় ভর্তুকির পরিমাণ ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুযোগ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। ঋণের তৃতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রগতি পর্যালোচনায় বর্তমানে আইএমএফের একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিশনটির কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ভর্তুকি কমিয়ে আনার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব অর্থায়ন বেশি থাকে। বহুপক্ষীয় সংস্থার অর্থায়ন যেখানে থাকে, সেখানে ব্যয়ের গুণগতমান তুলনামূলক ভালো থাকে। যদিও আমাদের নিজস্ব ব্যয়ের গুণগতমান বেশ খারাপ। অন্যান্য দেশের তুলনায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। তবে সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের ব্যয় বেড়েছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।’

Advertisement
Continue Reading
Advertisement

আবাসন সংবাদ

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।

গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।

ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।

এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।

Advertisement

আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।

পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।

মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।

বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।

Advertisement

রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।

ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।

মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।

Advertisement

প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।

দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’

তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।

Advertisement
Continue Reading

আবাসন সংবাদ

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও পরাঘাতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁরা ভূমিকম্প–পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে মতামত দেন। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করার কথাও বলেন তাঁরা।

এ পটভূমিতে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে যেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

Advertisement

তবে বন্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এর আগে আজ রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
আবাসন সংবাদ1 week ago

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে...

প্রধান প্রতিবেদন1 week ago

আমরা কি জেনেবুঝে বিপর্যয় ডেকে আনছি

ঢাকার মাটির নিচে যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, তার সামান্যতম বিচ্যুতিতেও এই মহানগরী এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। এই...

আবাসন সংবাদ1 week ago

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা

ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের...

আবাসন সংবাদ1 week ago

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের নেতৃত্বে আরিফুল-মোসলেহ উদ্দিন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর ১৭তম কার্যনির্বাহী পরিষদ (২০২৬–২০২৭) নির্বাচন ২০২৫ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত শুক্রবার (২১...

অর্থ ও বাণিজ্য1 month ago

দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট জগতে সফল বাংলাদেশি উদ্যোক্তা আকিব মুনির

দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত: এক দশকেরও কম সময়ে কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে...

Advertisement

সর্বাধিক পঠিত