অর্থ ও বাণিজ্যআবাসন সংবাদএডিটরস পিক

বিশ্ব আবাসনের নতুন কেন্দ্রবিন্দু রিয়াদে ৬৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড লেনদেন

Share
Share

রিয়াদে অনুষ্ঠিত মেগা-ইভেন্ট ‘সিটিস্কেপ গ্লোবাল’-এ রেকর্ড পরিমাণ লেনদেনের পর বৈশ্বিক আবাসন খাতের পরবর্তী প্রধান বিনিয়োগ হাব বা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে সউদী আরব। আন্তর্জাতিক প্রদর্শক এবং বিনিয়োগকারীদের এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মটি মূলত ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের (এসসিএমপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী এই আয়োজনটি বিশ্বের বৃহত্তম আবাসন প্রদর্শনী হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। এতে রেকর্ড ৬৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লেনদেন হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।

মেলাটি ৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালের প্রথম আয়োজনের পর থেকে এবার প্রদর্শনীর জায়গা দ্বিগুণ করা হয়েছে। মেলায় ৪২টি দেশের প্রদর্শকরা অংশ নেন, যার মধ্যে ১৫টি দেশ এবারই প্রথম এসেছে।

বিনিয়োগকারী এবং ডেভেলপারদের মধ্যে ৩৫০টিরও বেশি সফল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর আবাসন খাতের সাথে যুক্ত ডেভেলপার, স্থপতি, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং নীতিনির্ধারকরা এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।

ইভেন্টের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘তাহালুফ’-এর নির্বাহী ভাইস-প্রেসিডেন্ট র‍্যাচেল স্টার্জেস বলেন, “ধারণার বৈশ্বিক আদান-প্রদান এবং নতুন অংশীদারিত্বের সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করতে পেরে আমরা গর্বিত, যা আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ গঠনে সাহায্য করছে। এই গতিশীলতা মূলত আবাসন ও নগর উন্নয়নে একটি বৈশ্বিক হাব হিসেবে সউদী আরবের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেই প্রতিফলিত করে।”

“দ্য ফিউচার অব আরবান লিভিং” (নগর জীবনের ভবিষ্যৎ) প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সিটিস্কেপ গ্লোবাল-এ সউদী আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ ব্লুপ্রিন্টের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো প্রদর্শন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—উদ্ভাবন, স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক মানচিত্রের পুনর্গঠন করা, যা অর্থনীতিকে তেলের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে একটি বৈচিত্র্যময় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করবে।

এই ইভেন্টে সউদী আরবের নতুন আবাসন মালিকানা আইনের বিশাল সুযোগগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়। এই নতুন আইন অনুযায়ী, অ-সউদী (বিদেশি) নাগরিকরা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি এবং শিল্প সম্পত্তি কেনার সুযোগ পাবেন।

এই সংস্কারের মাধ্যমে অ-সউদী নাগরিকদের মালিকানা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই আইনটি রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের জোয়ার আনবে এবং বিশেষ করে এশিয়ার বিনিয়োগকারী ও ডেভেলপারদের জন্য বাজারের নতুন দুয়ার খুলে দেবে, যেখানে অনেক দেশের সরকারই মধ্যপ্রাচ্যে অংশীদারিত্ব ও অর্থনৈতিক সুযোগ খুঁজছে।

মেলায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সউদী-চীন চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় সউদী আরবে অ্যালুমিনিয়াম প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে, যা আবাসন ডেভেলপারদের কাঁচামাল সরবরাহ করবে।

সউদী আরব যখন অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য খোঁজার চেষ্টা করছে, তখন হংকং নিজেকে পূর্ব এশীয় বাজার (বিশেষ করে মূল ভূখণ্ডের চীনা পুঁজি) এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি সেতু বা মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

২০২৪ সালে হংকং মনেটারি অথরিটি এবং সউদী আরবের সার্বভৌম তহবিল ‘পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ (পিআইএফ) যৌথভাবে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি কো-ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গঠন করে, যা হংকংয়ের কোম্পানিগুলোকে সউদী আরবে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করছে। গত বছর, উভয় পক্ষ সউদী আরবের অবকাঠামো ও নির্মাণ প্রকল্প এবং হংকংয়ের প্রফেশনাল সার্ভিসের তথ্য বিনিময়ের ব্যাপারেও একমত হয়েছে।

সউদী আরবের এই আবাসন রূপান্তর এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নগরায়ণ ৬৮ শতাংশে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তা ৭৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিটিস্কেপ গ্লোবাল মূলত মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি বুদ্ধিমান ও টেকসই নগর পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ভিশন ২০৩০’-কে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি মেগা-প্রজেক্ট ইকোসিস্টেম, যা ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ৫,০০০-এরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে প্রধান দুটি প্রকল্প রয়েছে। এর একটি হলো কিদ্দিয়া সিটি। এটি ক্রীড়া ও বিনোদনের একটি উদীয়মান কেন্দ্রবিন্দু। এখানে স্পোর্টিং অ্যারেনা, কনসার্ট ভেন্যু, রেসট্র্যাক এবং থিম পার্ক থাকবে। এর মাধ্যমে ৩ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রতি বছর ৪ কোটি ৮০ লাখ পর্যটক আকৃষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।দ্বিতীয় প্রকল্পটি হচ্ছে দিরিয়াহ সিটি। সউদী আরবের এই ঐতিহাসিক কেন্দ্রে ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবাসন, হোটেল, বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক সুবিধার উন্নয়ন করা হচ্ছে, যেখানে পানি সংরক্ষণ, জ্বালানি দক্ষতা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে রয়েছে সউদী আরবের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনাররা—এনএইচসি, দিরিয়াহ কোম্পানি, রোশন গ্রুপ, নিউ মুরাব্বা, কিদ্দিয়া সিটি এবং রুয়া আল-হারাম আল-মাক্কি।

র‍্যাচেল স্টার্জেস পরিশেষে বলেন, ‘‘সউদী আরবের এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নকশা এবং টেকসইতার বৈশ্বিক নিয়মাবলীকে নতুন করে লিখছে। সিটিস্কেপ গ্লোবাল শীর্ষস্থানীয় ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীদের একত্রিত করে জীবনযাত্রার এক নতুন যুগের সন্ধান দিচ্ছে, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির সাথে গভীরভাবে জড়িত।’

Share

Don't Miss

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে প্রস্তুত ‘যমুনা’

জাতীয় নির্বাচনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ ছেড়েছেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এবার সেই ভবনেই উঠবেন...

কোম্পানি পর্যায়ে আয়কর রিটার্নের সময় এক মাস বাড়ল

কোম্পানি পর্যায়ে আয়কর রির্টান দাখিলের সময় আরও এক মাস বাড়লো। নতুন সময় অনুযায়ী কোম্পানি পর্যায়ে আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আয়কর রির্টান জমা দেওয়া...

Related Articles

আবাসন খাতের বড় আয়োজন রিহ্যাব সামার ফেয়ার ১২-১৫ আগস্ট, স্টল বুকিং শুরু

দেশের আবাসন খাতকে আরও গতিশীল করা, আবাসন প্রতিষ্ঠান, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক...

রিহ্যাব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান হলেন গাফ্ফার মিয়াজী

বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব)-এর সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত...

আবার ড্যাপ সংশোধন চান রিহ্যাব নেতারা

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের নেতারা আবারও রাজধানীর নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ)...

আবাসন খাতের নীতিগত জটিলতা নিরসনে রাজউক-রিহ্যাবের মতবিনিময় সভা

রাজধানীর পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়নে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) সংশোধন,...

<