আবাসন সংবাদ
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তৈরি ফ্ল্যাট পেতে চান সরকারি কর্মকর্তারা
রাজধানীর প্রথম দ্রুতগতির উড়ালসড়ক ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বিমানবন্দর-মগবাজার-যাত্রাবাড়ীর মধ্যে। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালসড়ক নির্মাণের কারণে যেসব ব্যক্তি জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের জন্য ঢাকার উত্তরা আবাসিক এলাকায় ১ হাজার ৩৪৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী, কেবল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাই ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ফ্ল্যাটগুলো তৈরি হওয়ার পর এ নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দের জন্য যোগ্য হবেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য এসব ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে উত্তরা মডেল টাউন (তৃতীয় ফেজ) সংলগ্ন বড়কাঁকর, বাউনিয়া ও দ্বিগুণ মৌজায়। এজন্য গড়ে তোলা হয়েছে একটি ‘পুনর্বাসন ভিলেজ’।
এখানে দুটি ব্লকে ভাগ করে ১২টি ভবনে ফ্ল্যাটগুলো তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ভবন ১৪ তলা। ব্লক-‘এ’র ফ্ল্যাটগুলো ১ হাজার ২৯৪ বর্গফুট আয়তনের। পার্কিং সুবিধাসহ প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। পার্কিং সুবিধা বাদে ফ্ল্যাটগুলোর দাম পড়বে ৫১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ব্লক-‘বি’তে নির্মিত ফ্ল্যাটগুলো ১ হাজার ৯০ বর্গফুট আয়তনের। পার্কিং সুবিধাসহ প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। পার্কিং সুবিধা ছাড়া ফ্ল্যাটগুলোর নির্ধারিত দাম ৪০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পুনর্বাসন ভিলেজে নির্মিত এসব ফ্ল্যাটের পাশাপাশি বিদ্যালয়, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, কমিউনিটি মার্কেট, কমিউনিটি ক্লিনিক, খেলার মাঠ, সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন, ইলেকট্রিক্যাল সাব-স্টেশন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেন, গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পুনর্বাসন ভিলেজটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামের আলাদা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে।
ফ্ল্যাটগুলোর বরাদ্দের জন্য একটি নীতিমালাও তৈরি করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পুনর্বাসন ভিলেজে ক্ষতিগ্রস্তদের অনুকূলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালার ধারা ২, অনুচ্ছেদ ১-এ বলা আছে, কেবলমাত্র ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগণ ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারবেন। সম্প্রতি এ অনুচ্ছেদ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগণ ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারবেন। পরবর্তীতে অগ্রগণ্যতার ক্রম অনুযায়ী খালি থাকা সাপেক্ষে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের চলমান প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেতু বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং অবশিষ্ট ফ্ল্যাট উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া যাবে। নীতিমালা সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন হলে ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠবেন সেতু কর্তৃপক্ষ ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা সংশোধনের এ উদ্যোগটিকে ‘নীতিমালার লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনাগুলো হতাশাব্যঞ্জক। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু দেখি না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমনিতেই নানা সুযোগ পেয়ে থাকেন। আমি মনে করি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি করা এসব ফ্ল্যাট প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরই বরাদ্দ দেয়া উচিত।’
তবে এ নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং আরো পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন সরকারের সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হোসেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট দেয়ার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সেতু কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ ১১৪ তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২৫ জুন। আমরা প্রস্তাব তুলেছিলাম, অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তসহ আরো কিছু ধরন যুক্ত করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা সংশোধনের। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বিষয়টি আরো পর্যালোচনা করা হবে। পর্যালোচনা করে বিষয়টি সেতু কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পরিচালনা পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে।’
ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ফ্ল্যাটগুলোয় আরো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সুযোগ করে দিতে অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদেরও বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে যে পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার বাইরেও অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের ফ্ল্যাট বরাদ্দের সুযোগ থাকায় এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’
সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, ১ হাজার ৩৪৪টি ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে এখন পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে ২৬১টি। এমন প্রেক্ষাপটে অবশিষ্ট ফ্ল্যাটগুলো ‘খালি থাকা সাপেক্ষে’ সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বেসরকারি জমির পরিমাণ কম হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা কম হয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এক সময় প্রকল্পটিতে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘এ প্রকল্পের জন্য বেসরকারি জমি খু্ব বেশি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা কম হতে পারে। তবে ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণের আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে যথাযথভাবে সমীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল।’
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য সব মিলিয়ে ২০৫ দশমিক ৮৬ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি জমি ১৭৬ দশমিক ৮৪ একর। সিংহভাগ সরকারি জমির মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে। মাত্র ২৯ দশমিক শূন্য ২ একর জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোকে সেতু কর্তৃপক্ষ ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরাদ্দ দেয়ার উদ্যোগটি প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সেতু বিভাগের অধীনে এ নীতিমালা হয়েছে। এখানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আমি মনে করি, তারা তাদের স্বার্থেই নীতিমালা পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ঘটনাও কিন্তু এক ধরনের দুর্নীতি। দুর্নীতি মানে শুধু লুটপাট বা চুরি করা নয়; এ ধরনের ঘটনাগুলোও দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। এই যে নিয়ম-নীতি, পদ্ধতি-এগুলো অপব্যবহার করে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করা এটাও দুর্নীতি। এ ধরনের ঘটনা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, যারা নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত, আমি মনে করি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে
ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।
গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।
এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।
পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।
মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।
বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।
ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।
মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।
প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’
তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা
ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও পরাঘাতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁরা ভূমিকম্প–পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে মতামত দেন। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করার কথাও বলেন তাঁরা।
এ পটভূমিতে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে যেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তবে বন্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এর আগে আজ রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল।
-
বিবিধ2 years agoবাংলাদেশে প্রচলিত বাড়ি ভাড়ার চুক্তি, নিয়ম ও নীতিমালা
-
নির্বাচিত প্রতিবেদন2 years agoরিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন যেভাবে
-
আবাসন সংবাদ3 months agoরাজউকের নির্দেশে নর্থ সাউথ গ্রীন সিটি বন্ধ
-
আইন-কানুন3 months agoদলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়
-
আবাসন সংবাদ3 months agoসীমান্ত রিয়েল এস্টেট এর অনুমোদনহীন সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি প্রকল্প
-
আইন-কানুন2 years agoরিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের সাথে জমি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সমস্যা ও তার প্রতিকার (১ম পর্ব)
-
আবাসন সংবাদ3 months agoপ্রিমিয়াম হোল্ডিংয়ের বর্ষপূর্তিতে ৩ দিনব্যাপী একক আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত
-
আবাসন সংবাদ11 months agoবন্ধ হচ্ছে অবৈধ আবাসন প্রকল্প
