আবাসন সংবাদ
চাহিদা কমায় মন্দা ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতে
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দেওয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উন্নয়নকাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে রড-সিমেন্টের বিক্রি কমেছে।
ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস
গত দুবছর ধরে মন্থর চাহিদা ছিল দেশের ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্তিমিত হয়ে পড়ায় এখন আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে এ খাত।
শিল্পসূত্রে জানা গেছে, গত দুমাসে কোম্পানিভেদে রডের বিক্রি ৫০–৭০ শতাংশ এবং সিমেন্টের বিক্রি ৩৫–৪০ শতাংশ কমেছে।
সূত্র জানায়, চাহিদা কমে যাওয়ায় গত দুমাসে হালকা স্টিলের রডের দাম টনপ্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে।
এর ফলে কারখানায় পণ্য মজুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুন উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। শিল্প মালিকেরা জানিয়েছেন, কাজ না থাকা সত্ত্বেও তারা শ্রমিকদের বেতন প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।
শিল্প নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো পুনরায় শুরু না হলে ইস্পাত এবং সিমেন্ট খাত দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
চাহিদা ও বিক্রিতে বড় পতন
চট্টগ্রাম-ভিত্তিক এইচএম স্টিল সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক ৬০০–৭০০ টন এমএস রড উৎপাদন করে। তবে চাহিদা ও বিক্রি কমে যাওয়ায় সম্প্রতি এটির উৎপাদন নেমে এসেছে ২৫০–৩০০ টনে।
এইচএম স্টিলের পরিচালক সারওয়ার আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা উৎপাদন খরচের তুলনায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা কম দামে রড বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে ক্ষতি কমাতে কারখানাটি ৫০–৬০ শতাংশ উৎপাদন হ্রাস করেছে।
তিনি আরও জানান, তাদের আরেকটি কারখানা গোল্ডেন স্টিলও দৈনিক উৎপাদন কমিয়ে ১৫০–২০০ টনে নামিয়ে এনেছে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল ৪০০–৫০০ টন।
বাজারের শীর্ষ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ মন্দা থেকে বাদ পড়ছে না। দেশের অন্যতম প্রধান রড উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম-ও বাজারের সাম্প্রতিক পতনে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্তিমিত হয়ে পড়েছে। নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারদের অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দেওয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উন্নয়নকাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে রড-সিমেন্টের বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছেন তারা।
বিএসআরএমের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সরকারি ও বেসরকারি নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন কোনো প্রকল্প শুরু হয়নি।
‘ফলে গত দুমাসে ইস্পাতের বাজারে বড় দরপতন হয়েছে। এ সময়ে ইস্পাতের চাহিদা ও বিক্রি ৫০ শতাংশ কমে গেছে। লোকসান কমাতে আমাদের উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে,’ তিনি বলেন।
উৎপাদন বন্ধ-কাটছাঁট
চাহিদা ও বিক্রি কমে ক্রমাগত লোকসান হওয়ায় চট্টগ্রামভিত্তিক আরেকটি ইস্পাত প্রস্তুতকারক কেআর স্টিল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।
কেআর গ্রুপের চেয়ারম্যান সেকান্দার হোসেন টিবিএসকে জানান, ‘রডের বাজারমূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে যাওয়ায় আমরা ২২ আগস্ট কারখানার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, কেআর স্টিলের দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা সাধারণত ২৫০ থেকে ২৭০ টন।
ঘোড়াশালে অবস্থিত এমএস রড কারখানাসহ পিএইচপি গ্রুপের একাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বলে জানান গ্রুপটির একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কারখানার মালিক ক্ষতি কমাতে তিন শিফটের পরিবর্তে দুই শিফটে কারখানা পরিচালনা করছেন এবং সপ্তাহে একদিনের বদলে দু’দিন কারখানা বন্ধ রাখছেন।
রড প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে ৭৫-গ্রেড (অটোমেটিক) এমএস রড কারখানা পর্যায়ে প্রতি টন ৮৬–৮৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দুমাস আগে ৯২–৯৪ হাজার টাকা ছিল।
একইভাবে, ৬০-গ্রেড (সেমি-অটো) রডের দাম দুই মাস আগের প্রতি টন ৮৬–৮৮ হাজার টাকা থেকে এখন প্রতি টন ৭৮–৮১ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
কেএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান জানান, প্রতি টন রডে বর্তমানে তারা ২৪ হাজার টাকা লোকসান করছেন। এক টন রড উৎপাদনে তাদের খরচ এক লাখ ১০ হাজার থেকে এক লাখ ১২ হাজার টাকা, অথচ তারা এটি বিক্রি করছেন মাত্র ৮৬ হাজার টাকায়।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) অনুসারে, দেশে প্রায় ২০০টি ইস্পাত কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০টি বড় কোম্পানি। এ খাতের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১.১০ কোটি টন রড, যেখানে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। এ খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা।
কাঁচামালের দাম উর্ধ্বমুখী
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তারা লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
তাহের গ্রুপের পরিচালক দিদারুল আলম জানান, চাহিদা কমে যাওয়ায় গত দুমাসে দেশীয় বাজারে স্ক্র্যাপের দাম ৫৮ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে গত তিনদিনে স্ক্র্যাপের দাম তিন হাজার টাকা বেড়ে বর্তমানে ৫৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে বলে তিনি জানান।
একইভাবে, বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধির কারণে পেলেটের দাম ৭৮ হাজার টাকা থেকে ৭০ হাজার টাকায় নেমে এখন প্রতি টন ৭২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাপে সিমেন্ট খাত
দেশে সিমেন্ট উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রিমিয়ার সিমেন্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলসহ সব বড় মেগা প্রকল্পের জন্য সিমেন্ট সরবরাহ করেছে।
তবে, কোম্পানির সিমেন্ট বিক্রি গত প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) আগের প্রান্তিকের (মার্চ–জুন) তুলনায় ২৫–৩৫ শতাংশ কমেছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক টিবিএসকে জানান, মূলত দুটি কারণে বিক্রি কমেছে। প্রথমত, বেশ কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্প থমকে গেছে। দ্বিতীয়ত, সিটি কর্পোরেশন থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নেতৃত্বশূন্যতার কারণে নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে সিমেন্ট ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। তিনি অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো দ্রুত পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি বস্তা সিমেন্ট ৪৬৫ থেকে ৪৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পাইকারি সিমেন্ট ব্যবসায়ী এবং মেসার্স আইজা এন্টারপ্রাইজের মালিক এস এম আরিফুজ্জামান জানান, সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ১০–১৫ হাজার বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হয়। তবে গত দুমাসে বিক্রি এতটাই কমেছে যে এখন প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২৫০–৩০০ বস্তা বিক্রি হচ্ছে।
আরেকটি বড় উৎপাদক রয়্যাল সিমেন্ট সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ৫০–৬০ হাজার বস্তা সিমেন্ট বিক্রি করত। কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক আবুল মনসুর জানান, গত দুমাসে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কারখানার প্রতিদিন ৯৬ হাজার বস্তা সিমেন্ট উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড় উৎপাদন ছিল ৫০–৭০ হাজার বস্তা। তবে, চাহিদার অভাবে আমাদের উৎপাদন কমিয়ে ২০–৩০ হাজার বস্তা করতে হয়েছে।’
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে ৪০টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি একই গ্রুপের অধীনে পরিচালিত। দেশের বার্ষিক প্রায় চার কোটি টন চাহিদার বিপরীতে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় সাত কোটি আট লাখ কোটি টন।
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে
ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।
গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।
এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।
পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।
মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।
বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।
ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।
মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।
প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’
তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।
আবাসন সংবাদ
ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা
ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও পরাঘাতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁরা ভূমিকম্প–পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে মতামত দেন। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করার কথাও বলেন তাঁরা।
এ পটভূমিতে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে যেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তবে বন্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এর আগে আজ রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল।
-
বিবিধ2 years agoবাংলাদেশে প্রচলিত বাড়ি ভাড়ার চুক্তি, নিয়ম ও নীতিমালা
-
নির্বাচিত প্রতিবেদন2 years agoরিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন যেভাবে
-
আবাসন সংবাদ3 months agoরাজউকের নির্দেশে নর্থ সাউথ গ্রীন সিটি বন্ধ
-
আইন-কানুন3 months agoদলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়
-
আবাসন সংবাদ3 months agoসীমান্ত রিয়েল এস্টেট এর অনুমোদনহীন সীমান্ত সিটি ও সীমান্ত কান্ট্রি প্রকল্প
-
আইন-কানুন2 years agoরিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের সাথে জমি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সমস্যা ও তার প্রতিকার (১ম পর্ব)
-
আবাসন সংবাদ3 months agoপ্রিমিয়াম হোল্ডিংয়ের বর্ষপূর্তিতে ৩ দিনব্যাপী একক আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত
-
আবাসন সংবাদ11 months agoবন্ধ হচ্ছে অবৈধ আবাসন প্রকল্প
