নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় কৃষি পর্যটন বা ‘অ্যাগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পের নামে আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট নির্মাণের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে ‘ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চটকদার বিজ্ঞাপন, উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি এবং নতুন সদস্য যুক্ত করার বিপরীতে কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ সংগ্রহ করত।
তাদের দাবি, শুরুতে কয়েক মাস নির্ধারিত লভ্যাংশ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন বিনিয়োগকারীরা মূলধন ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এতে হাজারো বিনিয়োগকারী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নেপথ্যে এমএলএম কাঠামোর অভিযোগ
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শামছুল আলম সজল। অভিযোগ রয়েছে, এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা এম আর খানসহ একটি চক্রের সহযোগিতায় বিনিয়োগ সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রকল্পের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চেয়ে নতুন বিনিয়োগকারী বা সদস্য সংগ্রহের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারলে কমিশন ও বোনাস দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হতো বলে তারা জানান। এ ধরনের কাঠামো প্রকল্পটির প্রকৃত ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নারী বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করার অভিযোগ
কয়েকজন নারী বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন, নারীদের আকৃষ্ট করতে আলাদাভাবে যোগাযোগ ও প্রচারণা চালানো হতো। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমা আক্তার (মনি) নামে এক নারী এ ধরনের বিনিয়োগ সংগ্রহে সক্রিয় ছিলেন বলে তারা দাবি করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তার কথায় বিশ্বাস করে অনেক নারী তাদের সঞ্চয় ও জীবনের শেষ সম্বল প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে তারা লভ্যাংশ তো দূরের কথা, বিনিয়োগের মূল অর্থও ফেরত পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন।
তবে সালমা আক্তারের বক্তব্যও এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি।
৩ লাখ থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্যাকেজ
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডে ৩ লাখ, ৬ লাখ এবং ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিভিন্ন প্যাকেজে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হতো। বিনিয়োগের বিপরীতে মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল বলে তারা জানান।
তাদের অভিযোগ, নতুন সদস্য যুক্ত করার মাধ্যমে অতিরিক্ত কমিশন ও বোনাস পাওয়ার সুযোগ দেখানো হতো। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদেরও প্রকল্পটিতে যুক্ত করেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক মাস প্রতিশ্রুত লভ্যাংশ দেওয়া হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ। এরপর বিনিয়োগকারীরা মূলধন ফেরত চাইলেও নানা কারণ দেখিয়ে তাদের অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১০০ বিঘা জমিতে রিসোর্টের প্রতিশ্রুতি
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শিবপুরের কামারগাঁও এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর আধুনিক রিসোর্ট ও কৃষি পর্যটন প্রকল্প গড়ে তোলার প্রচার চালানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রচারণায় প্রকল্পের বড় পরিসরের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার মিল নেই। জমির মালিকানা ও প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, কম্পিউটার-নির্মিত ছবি ও নকশা ব্যবহার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্পটির আকর্ষণীয় ভবিষ্যৎ তুলে ধরা হতো।
তবে প্রকল্পের জমির মালিকানা, অনুমোদন ও অন্যান্য নথি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গুলশানের কার্যালয় নিয়েও প্রশ্ন
এক ভুক্তভোগী জানান, বিনিয়োগের বিষয়ে সমস্যার পর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে গুলশানের ‘পুলিশ প্লাজা’ এলাকায় একটি কার্যালয়ের সন্ধান পান। তার দাবি, সেখানে গিয়ে অনেক সময় কার্যালয়টি বন্ধ পাওয়া যায়।
সরেজমিনে কার্যালয়টির কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। একই ভবনের মার্কেটে শামছুল আলম সজলের ‘সেনকো গোল্ড’ নামের একটি স্বর্ণের ব্যবসা রয়েছে বলেও ওই ভুক্তভোগী দাবি করেন।
এ ছাড়া সজলের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
‘জীবনের সব সঞ্চয় দিয়েছি’
এক ভুক্তভোগী বলেন, “উচ্চ মুনাফার আশায় জীবনের সব সঞ্চয় এখানে তুলে দিয়েছিলাম। এখন লভ্যাংশ তো দূরের কথা, মূল টাকা ফেরত পাওয়ারও কোনো উপায় দেখছি না। যোগাযোগ করতে গেলেও সংশ্লিষ্টদের পাওয়া যাচ্ছে না।”
তার মতো আরও অনেক বিনিয়োগকারী অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামছুল আলম সজল এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়েও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
বিনিয়োগের আগে যাচাইয়ের পরামর্শ
অর্থনীতি ও ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের আইনগত নিবন্ধন, ব্যবসার অনুমোদন, জমির মালিকানা, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং অর্থ ফেরতের শর্ত যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে নতুন সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে কমিশন, বোনাস বা মুনাফার ওপর কোনো প্রকল্পের কার্যক্রম অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
