Connect with us

আবাসন সংবাদ

সংশোধিত ড্যাপ বাতিলের দাবি আবাসন ব্যবসায়ীদের, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে মনে করছেন পরিকল্পনাবিদরা

সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বাতিলের দাবি জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। একই দাবি স্থপতিদেরও। তারা মনে করেন ড্যাপ পরিকল্পনা বৈষম্যমূলক। অন্যদিকে পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ড্যাপ বাতিল বা স্থগিত করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে স্থপতিরা বলেন, বাতিল হলেই সমাধান, সেটা না হলেও আপাতত স্থগিত করা দরকার।

এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বসবাস উপযোগিতার বিবেচনায় ঢাকার অবস্থান তলানিতে। এ অবস্থায় স্বার্থান্বেষী মহলের কথায় ড্যাপ বাতিল বা স্থগিত করা হলে তা এই শহরের জন্য আত্মঘাতী হবে। তবে ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংস্কার করা যেতে পারে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ইউএনবিকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে (রবিবার) রাজউকে ড্যাপ সংশোধন সংক্রান্ত কারিগরি কমিটির একটি সভা ছিল। সেখানে আবাসন ব্যবসায়ীরা একরকম বলপ্রয়োগ করে ড্যাপ সংশোধনের মনোভাব প্রদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে স্থপতিরাও সুর মেলান। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।’

তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকা বসবাস উপযোগিতা হারিয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যমান ড্যাপ বাতিল করে আগের ড্যাপ এবং ইমারত নির্মাণে ফিরে গেলে, যে যার খুশিমতো ভবন নির্মাণ করবে। বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হবে।

Advertisement

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘যে কোনো মাস্টারপ্ল্যানের ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে তা কারিগরি কমিটির মাধ্যমে সংশোধনও করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল বিদ্যমান ড্যাপ বাতিল করতে মরিয়া হয়ে লড়ছে। এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।’

গত ২১ আগস্ট আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে আবাসন খাতে ব্যাপক মাত্রায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। আগামী এক বছরে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। স্বৈরশাসকের প্রণীত বৈষম্যমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপের (২০২২-২০৩৫) কারণে খালবিল, জলাশয় ও কৃষিজমি দ্রুত গতিতে হ্রাস পাবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আবাসন এবং খাতসংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবসা স্থবির হওয়ায় আবাসন শিল্পে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ লোক বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির কথা ভেবে ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) বাতিল করে ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ ও মাস্টার প্ল্যান (ড্যাপ)-২০১০ বিধি অনুসারে ভবনের নকশা অনুমোদনের আদেশ দেওয়া যৌক্তিক হবে।

এদিকে বিদ্যমান ড্যাপ বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে। তাদের দাবি, বিদ্যমান ড্যাপ বাতিল হওয়া যৌক্তিক। আইনগত জটিলতার কারণে যদি বাতিল করা না যায়, তাহলে তা স্থগিত করতে হবে। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়া নগর পরিকল্পনাসংক্রান্ত দেশের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আসছেন বাস্থইসহ অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো।

এরইমধ্যে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রথম পর্যায়ে প্রস্তাবিত নগর অঞ্চলের ‘কাঠামো পরিকল্পনা’ গেজেটের মাধ্যমে অনুমোদন করার পর নগরের বিভিন্ন এলাকার জন্য ‘আরবান এরিয়া প্ল্যান’ ও পরিশেষে ‘ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান’ গেজেটের মাধ্যমে অনুমোদন করা হয়।

Advertisement

ড্যাপ (২০২২-৩৫) প্রণয়নের পূর্বে ‘ঢাকা কাঠামো পরিকল্পনা’ ২০১৬ সালে প্রণয়ন করা হলেও তা গেজেটভুক্ত না করে আইনি ব্যত্যয় ঘটিয়ে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে ২০২২ সালে এই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-৩৫) গেজেট করা হয়। কাজেই এই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-৩৫) বেআইনি প্রক্রিয়ায় প্রণীত হয়েছে।

এছাড়া কী প্রক্রিয়ায় বা কীসের ওপর ভিত্তি করে নগরীর ‘উন্নয়ন প্রাবল্য তীব্রতা’ ও ‘জনঘনত্ব’ নির্ধারণ করা হয়েছে তা জানতে চেয়ে বাস্থই এই পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ-উপাত্ত ও ওয়ার্কিং পেপারগুলো জনসাধারণ ও অংশীজনদের কাছে উন্মুক্ত করার জন্য বহুবার আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বাস্থই মনে করছে যে-এই পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। এজন্য তা বাতিল বা স্থগিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানায়, বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবার জন্য বাসযোগ্য নগর ও জনবসতি গড়তে দরকার নগর পরিকল্পনার প্রকৃত অনুশীলন ও কার্যকর বাস্তবায়ন। অথচ ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠীস্বার্থে আবাসন ব্যবসায়ী ড্যাপ বাতিলের মাধ্যমে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন করতে চায়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আইপিডি জানায়, আবাসন ব্যবসায়ীদের এই মহলের সঙ্গে কতিপয় পেশাজীবী ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে ইমারত ও আবাসনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন, বিধিমালা, পরিকল্পনাকে অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে ঢাকার বাসযোগ্যতাকে বিপন্ন করে তুলেছে। সংশোধিত ড্যাপ বাতিল হলে ঢাকার বাসযোগ্যতাকে আরও বিপন্ন করে তুলবে।

স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই মহলের ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থ যেন পরিকল্পিত ও টেকসই ঢাকা গড়ার পথে অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট নগর সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে আইপিডি।

Advertisement

আইপিডি জানায়, ঢাকা শহরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-৩৫) ২০২২ সালের ২৩ আগস্টে অনুমোদিত হয়। পরের বছরই আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তা আবার সংশোধন করা হয়। কোনো ধরনের কারিগরি সুপারিশ ছাড়া সংশোধিত প্রজ্ঞাপনও বাতিলের দাবি জানান পরিকল্পনাবিদরা।

একই সঙ্গে কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে ড্যাপ বহাল রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বাসযোগ্য শহর গড়ার কাজ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন তারা।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি মিটিংও করেছে রাজউক।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যমান ড্যাপ বাতিল বা স্থগিত করলে সেটা ভালো কোনো কাজ হবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিটিং করেছি। ড্যাপ সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে, সব পক্ষ খুশি থাকে এমন পর্যায়ে সংস্কার করা হবে। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।’

Advertisement
Continue Reading
Advertisement

আবাসন সংবাদ

৪ দিনব্যাপী আবাসন মেলা শুরু

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

রাজধানীতে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করেছে রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। গতকাল শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারের রিহ্যাব মেলায় ২২০টি স্টল থাকছে। প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন।

বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ খাতে বর্তমানে কিছুটা মন্দা থাকলেও এটি স্থায়ী নয়, সুদিন অবশ্যই ফিরে আসবে।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আজ যদি কোনো প্লট মালিককে নিজের টাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে বলা হয়, তা হলে ঢাকা শহরে কয়টি ভবন আদৌ তৈরি হতোÑ তা ভাবনার বিষয়। ডেভেলপারদের বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন ডেভেলপাররা শুধু নিজেদের ব্যবসার কথা ভাবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই ধারণা সঠিক নয়। হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন ব্যতিক্রম থাকতে পারেন, তবে সবাই একটি সুন্দর, পরিকল্পিত ও নিয়মের মধ্যে গড়ে ওঠা শহরই চান।

রিয়াজুল ইসলাম আরও বলেন, লক্ষ্য শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা। গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণা একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে এ জায়গায় যেতে হবে। তিনি বলেন, যে শহর বা ভবনে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে না, সেই উন্নয়ন কোনো কাজে আসে না। এতে কিছু ব্যক্তি লাভবান হয়, কিন্তু দেশ বা সমাজের উপকার হয় না।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট মো. ওয়াহিদুজ্জামান সদস্য এবং ক্রেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতে মেলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকৎ আলী ভুইয়া আবাসন খাতের বিভিন্ন অবদানের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ)-এর চেয়ারম্যান মোছা. ফেরদৌসী বেগম নিয়ম অনুযায়ী ভবন তৈরির কথা বলেন।

Advertisement

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রিহ্যাবের পরিচালক ও মেলা কমিটির কো-চেয়ারম্যান মিরাজ মোক্তাদির। অনুষ্ঠানে রিহ্যাবের ভাইস প্রসেডিন্টে-১ লায়ন এমএ আউয়াল (সাবেক এমপি), রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ এবং রিহ্যাব ফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ ইঞ্জি. আব্দুল লতিফ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট হাজি দেলোয়ার হোসেন, রিহ্যাব পরিচালক ও ফেয়ার স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরুজ সরদার, রিহ্যাব পরিচালক ও প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ লাবিব বিল্লাহ্সহ রিহ্যাব পরিচালকবৃন্দ এবং অন্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন। মেলায় দুই ধরনের টিকিট থাকছে। একটি সিঙ্গেল এন্ট্রি অপরটি মাল্টিপল এন্ট্রি। সিঙ্গেল টিকিটের প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। আর মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিটের প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিট দিয়ে একজন দর্শনার্থী মেলার সময় পাঁচবার প্রবেশ করতে পারবেন। এন্ট্রি টিকিটের প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ দুস্থদের সাহায্যার্থে ব্যয় করা হবে। এ বছর প্রতিদিন র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হবে।

Continue Reading

আবাসন সংবাদ

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।

গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।

ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।

এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।

Advertisement

আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।

পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।

মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।

বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।

Advertisement

রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।

ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।

মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।

Advertisement

প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।

দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’

তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।

Advertisement
Continue Reading
Advertisement
Advertisement
অর্থ ও বাণিজ্য6 days ago

প্রিমিয়াম হোল্ডিং এর ৩ দিন ব্যাপী পিঠা উৎসব ও একক আবাসন মেলা

দেশের অন্যতম সেরা আবাসন কোম্পানী প্রিমিয়াম হোল্ডিং লিমিটেড প্রতি বছরের মতো এবারো বাংলা ও বাঙালীর ঐতিহ্য শীতকালকে উপলক্ষ করে ০৮-১০...

আবাসন সংবাদ3 weeks ago

৪ দিনব্যাপী আবাসন মেলা শুরু

রাজধানীতে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করেছে রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। গতকাল শুরু হওয়া এ মেলা চলবে...

আবাসন সংবাদ2 months ago

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে...

প্রধান প্রতিবেদন2 months ago

আমরা কি জেনেবুঝে বিপর্যয় ডেকে আনছি

ঢাকার মাটির নিচে যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, তার সামান্যতম বিচ্যুতিতেও এই মহানগরী এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। এই...

আবাসন সংবাদ2 months ago

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা

ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের...

Advertisement

সর্বাধিক পঠিত