Connect with us

আবাসন সংবাদ

ইমারত বিধিমালা ২০২৪ খসড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন আবাসন ব্যবসায়ীরা

ইমারত বিধিমালা ২০২৪ খসড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন আবাসন ব্যবসায়ীরা

নিয়মিত অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন নগরবাসী। ভূমিকম্প আতঙ্কও কম নয়। চলতি বছর তাপপ্রবাহও ভাবিয়েছে নগরায়ণ নিয়ে। ঢাকায় ভবন তৈরিতে নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানা হয় না ইমারত বিধিমালা। যে কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কঠিন হয় সামাল দেওয়া।

এসব বিষয় মাথায় রেখেই ইমারত নির্মাণ বিধিমালার খসড়ায় আনা হয়েছে বেশকিছু পরিবর্তন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার) পুনর্বিন্যাসে। ফারের মাধ্যমে ভবনের উচ্চতা, ফ্ল্যাটের আয়তন, কতগুলো ফ্ল্যাট হবে সেটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে নতুন বিধিমালায়। এতে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা কমবে এবং ভবন পরিবেশবান্ধব হবে বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

‘নতুন বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা ও আয়তন কমবে। ফলে কমবে ফ্ল্যাটের সংখ্যা। ব্যবসায়ীরা আবাসন খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। শুধু আমরা না, জমির মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মধ্যবিত্তকে ফ্ল্যাটের আশা ছেড়ে দিতে হবে।’-আবাসন ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী ভূঁইয়া

তবে আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইমারত বিধিমালা ২০২৪ এর খসড়া পাস হলে ফারের কারণে মুখ থুবড়ে পড়বে আবাসন ব্যবসা। সরকার হারাবে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব। আবাসনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, জমির মালিকও পড়বেন ক্ষতির মুখে। জমির সংকট দেখা দেবে, চাপ বাড়বে কৃষিজমির ওপর। ব্যাহত হবে পরিবেশ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা পাস হলেই দুই থেকে তিন বছর সময় পাবেন উদ্যোক্তারা। এরপর অর্থাৎ আগামী দুই বছর পরে বর্তমানে যেসব ফ্ল্যাট প্রতি স্কয়ার ফুট সাত হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে, সেটা ১০ হাজার টাকায় কিনতে হবে।

Advertisement

আর রড-সিমেন্টের দাম বাড়লে ১০ হাজারের সঙ্গে আরও বর্ধিত দাম যোগ হবে। অর্থাৎ উচ্চবিত্তদের জন্যই হবে ফ্ল্যাট, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। পাশাপাশি সিংহভাগ ডেভেলপার কোম্পানি টিকতে পারবে না।

বলা হয়েছে-কোনো এলাকার ফার আড়াই (২.৫) এবং সেখানে প্লটের ফার যদি তিন নির্ধারণ করা হয়, তবে রাজউক প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) মতে সর্বনিম্ন ফার কাউন্ট করতে হবে। তার মানে এখানে কাউন্ট হবে আড়াই। এতে রাস্তা বড় হওয়া সত্ত্বেও কমে আসবে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা। প্লট সংলগ্ন রাস্তার ফারকে বেসিক ধরলে বিল্ডিংটা আরও একটু বড় হবে। আবার ফ্ল্যাটের আয়তনও বাড়বে।

এখানে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে সবকিছু। যেমন কোন জমিতে কতটি ইউনিট, ফ্ল্যাট কতটা হবে সেটা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এখানে আয়তনও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ খসড়া পাস হলে এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাঁচটার জায়গায় ১০টি ফ্ল্যাট করা যাবে না। পাঁচ কাঠায় ছোট ছোট ইউনিট করে চারটা ফ্ল্যাট করার সুযোগ থাকবে না।

২০ ফুট রাস্তার ফার দুই হলে করা যাবে চারতলা বাড়ি। আর ২০ ফুটের নিচে হলে ফার আরও কমে দেড় বা পৌনে দুই হবে, সেক্ষেত্রে তিন থেকে সাড়ে তিনতলা বাড়ি করা যাবে। এতে জমি দিতে আগ্রহী হবেন না মালিক। কারণ ডেভেলপার কোম্পানিগুলো সাধারণত যেসব জমি নেয় সেখানে দুই থেকে তিনতলা বিল্ডিং ভেঙে ডেভেলপ করে। এখানে জমি ডেভেলপ হলেও বাড়ি তিনতলাই হচ্ছে।

আগের নিয়মে ১৬ ফুট রাস্তায় জমির মালিক রাস্তা ৪ ফুট ছেড়ে দিলে একটু ফার বাড়িয়ে দেওয়া হতো। দাম ছাড়াই রাস্তা ছেড়ে দিলে সরকার একটু ফার দিতো। এতে রাস্তা প্রশস্ত হতো।

Advertisement

খসড়ামতে, ১৬ ফুট রাস্তার ফার দেড় (১.৫)। এখানে রাস্তা ১৬ ফুট আছে, তবে জমির মালিক উভয় পাশে ৪ ফুট ছেড়ে দিলে ২০ হয়। এখানে ফার দুই হয়। অর্থাৎ, এখানে চারতলা বাড়ি করার সুযোগ আছে। জমির দুদিকে ছেড়ে (ইফেক্টিভ সেটব্যাক) দিয়ে আগের নিয়ম অনুযায়ী ফার বাড়ানোর কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরা চাই প্লট সংলগ্ন রাস্তার ফারকে বেসিক ফার ধরা হোক। এতে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা বাড়বে। ফ্ল্যাটের সংখ্যা নির্দিষ্ট, আয়তন নির্দিষ্ট, উচ্চতা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে এটাও চাই না। এমনটা করা মানে হাত-পা বেঁধে পানিতে ছেড়ে দেওয়া।

ফার এক বাড়ানো হোক। ড্যাপ যা করছে, বিধিমালায় কিছু পরিবর্তন হোক। সব শ্রেণির ক্ষেত্রে রাস্তার ফার এক বাড়ানো হোক, কমপক্ষে দশমিক ৫ বাড়ানো হোক। এটা হলেও তা ২০০৮ এর বিধিমালার চেয়েও অনেক কম হবে। তবুও কিছুটা স্বস্তি আসবে। হয়তো ব্যবসা টিকে থাকবে।

‘কোনো ধরনের মতামত ছাড়াই ইমারত নির্মাণ বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। খসড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় যেভাবে নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে তাতে সাধারণ নাগরিক, ভূমি মালিক ও ভবন মালিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’-রিহ্যাব সভাপতি মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান

আবাসন ব্যবসায়ী এবং ব্রিক ওয়ার্কস লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, নতুন বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা ও আয়তন কমবে। ফলে ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমবে। ব্যবসায়ীরা আবাসন খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জমির মালিকও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উলম্বভাবে ভবন তৈরির দিকে, আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। আমাদের জমির সংকট আগামীতে আরও মারাত্মক হবে। কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়বে, মধ্যবিত্তকে ফ্ল্যাটের আশা ছেড়ে দিতে হবে।

Advertisement

এ বিষয়ে মগবাজার এলাকার বাসিন্দা রিপন বলেন, ঋণ নিয়ে আমাদের একটা প্লট নিজেরাই ডেভেলপ করেছি। একটা ব্যবসাও করছি। আরও কিছুটা সময় লাগবে ঋণ পরিশোধ করতে। এখন যে বিধিমালা করা হচ্ছে এতে অন্য জমিটি নষ্ট হবে। আমার জমির চারপাশে ১০-১৩ তলা বিল্ডিং হয়েছে। দুই বছর পর আমাদের তাহলে চারতলা বিল্ডিং করতে হবে?

ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০২৪ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সভাপতি এবং জাপান গার্ডেন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, কোনো ধরনের মতামত ছাড়াই ইমারত নির্মাণ বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিধিমালা চূড়ান্ত না করার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউককে অনুরোধ জানাই। খসড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় যেভাবে নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে তাতে সাধারণ নাগরিক, ভূমি মালিক ও ভবন মালিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আবাসনশিল্প।

গত ২১ এপ্রিল কার্বন নিঃসরণহীন, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।

‘২০০৮ সালের বিধিমালা যেটা হয়েছিল সেটা বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। এখন নগরে সবুজ নেই, রাস্তা নেই। নতুন যে বিধিমালা করা হয়েছে সেটা শুধু বাস্তবসম্মতই নয় বিজ্ঞানসম্মতও।’-ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম

Advertisement

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) পরিচালনা পর্ষদের সভায় তিনি জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য যে সব আইন, তা বঙ্গবন্ধু স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করেছিলেন। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তিনি জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ সেন্টারও তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরিবেশ সুরক্ষা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কার্বন নিঃসরণহীন, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী উদ্ভাবনে গবেষণার জন্য এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।

এ বিষয়ে কথা হলে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, এর আগে ২০০৮ সালের বিধিমালা যেটা হয়েছিল সেটা বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। এখন নগরে সবুজ নেই, রাস্তা নেই। নতুন যে বিধিমালা করা হয়েছে সেটা শুধু বাস্তবসম্মতই নয় বিজ্ঞানসম্মতও।

তিনি বলেন, ফার কম-বেশির কারণে ব্যবসায়ী-ভূমির মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এটা একটা প্রোপাগান্ডা। কারণ বিল্ডিং কম হলে তো খরচও কম হবে, এতে বাড়তি খরচ বা লোকসানের কিছু নেই। আবার মেট্রো এলাকায় যেখানে ফার বেশি সেখানে অন্য সুবিধাও বেশি এবং বড় বিল্ডিং তৈরির সুযোগ আছে।

এছাড়া সরকার সবার জন্য জনকল্যাণমূলক বাসযোগ্য শহর করতে চায়। আর সেটা গুরুত্ব দিয়েই খসড়া নীতিমালা করা হয়েছে।

Advertisement

আবাসন সংবাদ

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মত দিয়েছেন ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা।

গত শুক্র ও গতকাল শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা এমন ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।

ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা যত কম হবে, তত বেশি ঝাঁকুনি হবে। শুক্রবারের ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এ ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার এবং সাড়ে সাত ঘণ্টার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আরও একটি ভূমিকম্প হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। এ ভূমিকম্প দুটোরই উৎপত্তি ছিল নরসিংদী। সন্ধ্যায় কাছাকাছি সময়ে আরও একটি ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা; যার মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭।

এসব মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ভূমিকম্প ঢাকার ঝুঁকি কতটা স্পষ্ট করছে, তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে।

Advertisement

আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে শুক্রবার নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল।

পাঁচ বছরে ১৮ জেলায় ভূমিকম্প হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রাম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রে একসময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মমিনুল ইসলাম। এখন তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে এর আগেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে মাত্রা ছিল কম। বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।

মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীতে আগে ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়। এটা ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।

বেশি ভূমিকম্প রাতে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হওয়া ৩৯টি ভূমিকম্প কোন সময় হয়েছে, সেটিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্প হয়েছে রাতে। যেমন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে ২৩টি। বাকি ১৬টি ভূমিকম্প হয়েছে দিনের বেলায় (ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।

Advertisement

রাতে বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে অথবা বাসায় থাকে। এমন সময়ে ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যে পরিমাণ ভূমিকম্পের শক্তি সাবডাকশন জোনে (দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল) পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, তার ১ শতাংশের কম নির্গত হয়েছে। ফলে বারবার হওয়া এই ভূকম্পগুলো বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর ‘আফটার শক’ হবে, এমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে আফটার শকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের যে ফাটল বা ফল্ট লাইনটি এত দিন ধরে প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে আটকে ছিল, তা নড়তে শুরু করেছে এবং শক্তি নির্গমনের একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এমন আফটার শক হতে হতে বড় ভূমিকম্প হবে। সেটা খুবই নিকটে হতে পারে।

ঝুঁকির চার কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার নৈকট্য একটা কারণ। ঢাকার কাছে এ ফল্টটা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেটা এখন খুলতে শুরু করেছে। যার প্রভাবে সামনে আরও ভূমিকম্প হতে পারে।

মাটির গঠনকে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাকিব হাসান বলেন, ঢাকার নতুন অংশগুলো খুব নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এমন অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ঢাকার ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ডিজাইন কোড মেনে হচ্ছে না। চার নম্বর হলো ঢাকা শহরের জনঘনত্ব। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে।

Advertisement

প্রস্তুতি কেমন
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেও গত এক দশকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁওয়ে এক একর জায়গা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য কমপক্ষে আরও ২৫ বর্গমিটার জায়গা থাকা দরকার। সেটা পাওয়া যায়নি।

দুর্যোগের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার জন্য আরও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে আমরা সে সংগ্রহ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা উপকূলে আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন। নগরে আছে ৪৮ হাজার। তাঁদের যুক্ত করে মানুষকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করব।’

তবে প্রস্তুতি ও করণীয় দিকগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায়ে চিঠি দিয়েছে দুর্যোগের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ধরনের দুর্যোগে এমনিতে তথ্য আসার কথা। সেটার জন্য চিঠি দিতে হবে কেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নরসিংদীর দুর্যোগের তথ্য আসতে লেগেছে এক দিনের বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের জায়গা নেই জানিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, যে দেশগুলো স্থানীয় সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। দুর্যোগ নিয়ে সচেতনতার বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা লাফিয়ে পড়েছে। এ রকম কেন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চর্চা করায় না। এটা স্কুল থেকে শেখাতে হবে।

Advertisement
Continue Reading

আবাসন সংবাদ

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা

Published

on

By

আবাসন কনটেন্ট কাউন্সিলর

ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও পরাঘাতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁরা ভূমিকম্প–পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে মতামত দেন। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করার কথাও বলেন তাঁরা।

এ পটভূমিতে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে যেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

Advertisement

তবে বন্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এর আগে আজ রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
আবাসন সংবাদ1 week ago

ভূমিকম্পে ঢাকার বড় বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে

ভূমিকম্পে রাজধানী শহর ঢাকার বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে...

প্রধান প্রতিবেদন1 week ago

আমরা কি জেনেবুঝে বিপর্যয় ডেকে আনছি

ঢাকার মাটির নিচে যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, তার সামান্যতম বিচ্যুতিতেও এই মহানগরী এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। এই...

আবাসন সংবাদ1 week ago

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা

ভূমিকম্প–পরবর্তী উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের...

আবাসন সংবাদ1 week ago

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের নেতৃত্বে আরিফুল-মোসলেহ উদ্দিন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর ১৭তম কার্যনির্বাহী পরিষদ (২০২৬–২০২৭) নির্বাচন ২০২৫ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত শুক্রবার (২১...

অর্থ ও বাণিজ্য1 month ago

দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট জগতে সফল বাংলাদেশি উদ্যোক্তা আকিব মুনির

দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত: এক দশকেরও কম সময়ে কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে...

Advertisement

সর্বাধিক পঠিত